ডোনাল্ড ট্রাম্প কি অভিশংসনের পথে

মাহবুব মাসুম

২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আমেরিকান রাজনীতিতে বহুবার তার অভিশংসনের ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মিথ্যা বলা, অসঙ্গতিপূর্ণ ব্যবহার করা, সুস্পষ্ট পররাষ্ট্রনীতি দিতে না পারা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এসব কখনোই খুব একটা অস্বস্তিতে ফেলতে পারেনি। চরম ডানপন্থা আর আমেরিকান শ্রেষ্ঠত্বের বুলি কপচিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বিরুদ্ধে যাবতীয় অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছেন। নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ, ডোনাল্ড ট্রাম্পের যৌন কেলেঙ্কারিও তার গায়ে আঁচড় ফেলতে পারেনি।

অভিশংসন নিয়ে জনগণের মধ্যে যেমন বিভক্তি ছিল, বিভক্তি ছিল ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও। প্রগতিশীল খ্যাত ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশ বিভিন্ন ইস্যুতে কংগ্রেসের স্পিকার ন্যান্সি পোলেসির কাছে অভিশংসনের ইস্যুটি তুলে ধরেছে। ন্যান্সি পোলেসি দুই পক্ষের মধ্যে ভারসাম্যের নীতি নিয়েই এগোচ্ছিলেন।

সবকিছু নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন ঘটেছে ট্রাম্পের সঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের কথোপকথনের বিষয়টি সামনে আসার পর। ন্যান্সি পোলেসিও ভারসাম্যের নীতি ছেড়ে জাতীয় নিরাপত্তা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিশ্বাসঘাতকতার প্রশ্নে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিশংসনে তদন্তের ঘোষণা দিয়েছেন। অনেকগুলো কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসনের নীতিতে যেতে পোলেসি এবং ডেমোক্র্যাটদের অনুপ্রাণিত করেছে।

প্রথমত, জনমত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। চ্যানেল সিবিএস-এর রিপোর্ট বলছে, ৫৫ ভাগ মানুষ ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিশংসনের পক্ষে। আর অভিশংসনের পক্ষে স্বাক্ষর করেছে ৮ লাখ মানুষ।

দ্বিতীয়ত, বিভক্ত ডেমোক্র্যাটরা এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিশংসনের পক্ষে এক হয়েছে। জরিপ বলছে, ৯৪ ভাগ ডেমোক্র্যাট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিশংসন চান।

তৃতীয়ত, কংগ্রেসে অভিশংসন প্রস্তাব পাশ হওয়ার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে ডেমোক্র্যাটদের। এরই মধ্যে ২২৩ জন ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান অভিশংসনের পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেছেন। সম্ভাবনা আছে ৫৫ জন রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যানের সমর্থন পাওয়ার। কংগ্রেসে এই প্রস্তাব পাশ হওয়ার জন্য ২১৮ জন কংগ্রেসম্যানের সমর্থনই যথেষ্ট।

চতুর্থত, ২০২০ সালের ইলেকশনকে সামনে রেখে এই অভিশংসন প্রস্তাব ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের উত্সাহিত করবে। পাশাপাশি সুইচ ভোটগুলোও ডেমোক্র্যাটদের ভোটব্যাংকে আসার সম্ভাবনা থাকবে।

পঞ্চমত, গণতন্ত্রের ধারক বাহক আমেরিকান ডেমোক্র্যাটরা এটাকে নিজেদের সাংবিধানিক দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন। অনেক ডেমোক্র্যাট মনে করছেন, এই অবস্থায় অভিশংসনের প্রস্তাব না তুললে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না।

ষষ্ঠত, বৈশ্বিক যে পপুলিজমের উত্থান হচ্ছে, তাদের সুসংহত করার কাজটা অনেকদিন ধরেই ডোনাল্ড ট্রাম্প করে যাচ্ছেন। এই কাজে তিনি পাশে পেয়েছেন বরিস জনসনের মতো জনতুষ্টিবাদী নেতাদের। প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটরা অভিশংসনের উদ্যোগকে প্রতীকী অর্থে জনতুষ্টিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন।

প্রথাগত রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের ক্রমেই কোণঠাসা করে ফেলছিলেন। বিশ্বব্যাপী তার দেখাদেখি বিভিন্ন দেশে উত্থান ঘটছিল ডানপন্থার। নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ, ম্যুলারের তদন্ত, ব্যক্তিগত আইনজীবী মাইকেল কোহেনের স্বীকারোক্তি, যৌন কেলেঙ্কারি আড়াল করতে টাকা দেওয়ার অভিযোগ, রাশিয়ার সঙ্গে আঁতাত, ইরাক-আফগানিস্তান-সিরিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহার ইস্যু কিংবা মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ, কোনো কিছুই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারেনি। তবে এইবার জাতীয় নিরাপত্তা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিশ্বাসঘাতকতার ইস্যু তুলে কংগ্রেসে অভিশংসনের প্রস্তাব স্পষ্টতই ট্রাম্পের অবস্থানকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। বিরামহীনভাবে টুইটারে হুইসেলব্লেয়ার আর ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের পোস্ট দিয়ে যাওয়া সেই কথাই প্রমাণ করে। এই অবস্থায় ট্রাম্পের আশার দিক একটাই, রিপাবলিকানরা তাকে ছেড়ে যায়নি। কংগ্রেসে অভিশংসনের প্রস্তাব পাশ হয়ে গেলেও রিপাবলিক সংখ্যাগরিষ্ঠ সিনেটে সেটা পাশ হওয়ার সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ।

স্পিকার ন্যান্সি পোলেসির ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিশংসনের উদ্যোগ বৈশ্বিক রাজনীতিতে আলোড়ন তুলেছে তাতে সন্দেহ নেই। ডেমোক্র্যাটরা এখন পর্যন্ত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অভিশংসন প্রস্তাব নিয়ে এগিয়েছে। প্রভাবশালী পত্রিকা গার্ডিয়ান এই উদ্যোগকে ‘প্রয়োজনীয় ঝুঁকি’ হিসেবে অভিহিত করেছে। রাজনৈতিকভাবে এই ঝুঁকি নেওয়া কতটা সফল হবে, সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে এখন আমেরিকার রাজনীতিতে কান পাতলেই শোনা যাবে, ‘যদি ট্রাম্প অভিশংসিত না হয়, তবে কে?’ ‘এখন নয় তো কখন?’

n  লেখক :শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়