ভাঙনের কবলে নদী ও স্থাপনা

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার খোলাবাড়ীর চরে একটি বিদ্যালয় গাছপালা সমেত অর্ধেকখানি ডুবিয়া গিয়াছে নদীর পানিতে। নদীভাঙনের মুখে বিদ্যালয়ের এই ডুবিয়া যাইবার ছবিটি গত বুধবার ছাপা হইয়াছে দৈনিক ইত্তেফাকে।

বর্ষায় নদীভাঙনের কারণে স্কুল, সরকারি প্রতিষ্ঠানসহ স্বাস্থ্যকেন্দ্র নদীগর্ভে বিলীন হইবার ছবি প্রায়শই ছাপা হইয়া থাকে পত্রপত্রিকায়। কিছুদিন পূর্বে পদ্মানদীর ভাঙন লইয়া একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করিয়াছিল মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। ঐ প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, পদ্মার ভাঙনে ১৯৬৭ সাল হইতে এখন অবধি ৬৬ হাজার হেক্টরের বেশি জমি বিলীন হইয়াছে। সম্প্রতি শরীয়তপুর, রাজবাড়ী ও মাদারীপুরে পদ্মার ভাঙনে আবাদি জমি, বসতবাড়ি, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ কয়েক শত স্থাপনা বিলীন হইয়াছে। চাঁদপুর সদরের ওমর আলী উচ্চ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হইবার পর ৯ বার নদীগর্ভে বিলীন হইয়াছে। বিদ্যালয়টি বারবার ভাঙনের শিকার হইবার কারণে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি এখন একটি ভাসমান স্কুলের জন্য আবেদন জানাইয়াছে।

নদীমাতৃক দেশ হিসাবে আমাদের দেশে ‘নদীভাঙন’ একটি কঠিন বাস্তবতা। আমাদের ভূমি পলিবাহিত ব-দ্বীপ বলিয়াই অত্যন্ত ভঙ্গুর। ফলে বর্ষার জলগর্ভ ভরা নদীর স্রোতের ধাক্কায় বা নিরন্তর পানির তোড়ে অতি সহজেই তাহার কূল ভাঙিয়া যায়। নদীপাড়ের নিম্নাংশে অবস্থিত নরম পলিমাটি পানির ধাক্কায় ধাক্কায় গলিয়া যাইবার কারণে নিচের দিকটা ক্রমশ ফাঁপা হইতে থাকে এবং উপরের শক্ত মাটি প্রথমে ধসিয়া যায়, পরে তাহা ভাঙিয়া পড়ে। সুতরাং নদী-তীরবর্তী অংশে ভাঙনের ঘটনা প্রকৃতির অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা।

কোনো ভবন স্থাপনা করিবার অনুমতি পাইতে সেইখানকার মাটি যথাযথভাবে পরীক্ষা করাটা বাধ্যতামূলক। নদী-তীরবর্তী এলাকার মাটি অত্যন্ত নাজুক বিধায় ওই সকল অঞ্চলে যেকোনো স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের জন্য মাটি পরীক্ষার পর যেই ধরনের নির্মাণ প্রকৌশল গ্রহণ করিতে হইবার কথা, তাহা ঠিক থাকিলে ভবন ভাঙিবার সুযোগ নাই। উহা ব্যয়বহুল হইতে পারে, কিন্তু একটি স্থাপনা যে কোনো জায়গাতেই টেকসইভাবে নির্মাণ করা সম্ভব উপযুক্ত প্রকৌশলের মাধ্যমে। সুতরাং নদী তীরবর্তী অঞ্চলে স্থায়ী স্থাপনা ভাঙিবার ক্ষেত্রে কোথাও না কোথাও গাফিলতি রহিয়াছে। এই বিষয়টি গুরুত্বের সহিত ভাবিয়া দেখিতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে, বর্তমানে প্রায় সোয়া ২ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ নদীতীর ভাঙনপ্রবণ। বিগত তিন যুগে এই দেশের দুই কোটি মানুষ নদীভাঙনের শিকার হইয়াছে। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের আট জেলায় গত তিন দশকে প্রায় ১ কোটি মানুষ নদী ভাঙনের শিকার হইয়া ভূমিহীন ও সর্বস্বান্ত হইয়াছে। দেশে প্রায় কোটির উপরে স্থায়ী ভূমিহীন পরিবার রহিয়াছে, তাহার মূল কারণ এই নদীভাঙন। ফি বত্সর আমাদের আর্থিক ক্ষতিও নেহাত কম নহে। তাহার পরিমাণ প্রায় হাজার কোটি টাকা!

ভাঙনপ্রবণ অঞ্চলের ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রকৌশলগত দিক হইতে যাহা যাহা অনুসরণ করিতে হয়, সেই ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অবহেলা বা গাফিলতি কাম্য নহে। কারণ ইহার জন্য অনেক বেশি মূল্য চুকাইতে হয়।