প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে উত্তম পরিবেশ বিরাজ করছে। তিনি ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে শিক্ষা, অটোমোটিভ ও হাল্কা প্রকৌশল এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমরা এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক হাব (কেন্দ্র) হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারি। নিজস্ব ১৬ কোটি জনগণ ছাড়াও প্রায় ৩০০ কোটি মানুষের একটি বিশাল বাজারের যোগাযোগের পথ হতে পারে বাংলাদেশ।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে নয়াদিল্লির হোটেল তাজ প্যালেসের দরবার হলে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ইন্ডিয়া ইকোনমিক সামিটে বাংলাদেশের ওপর কৌশলগত আলোচনাকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ সম্ভাবনা, বিভিন্ন খাতের উন্নয়ন নিয়েও তিনি কথা বলেন। ৪০টি দেশের ৮০০ প্রতিনিধি দুই দিনের এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন। আজ সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতা দেবেন। এর আগে গতকাল সকাল সোয়া ৮টায় ঢাকা থেকে রওনা হয়ে ৯টা ৫০ মিনিটে দিল্লির পালাম বিমান ঘাঁটিতে পৌঁছান শেখ হাসিনা।
সম্মেলনে শেখ হাসিনা বলেন, অনেকেই বাংলাদেশকে ‘তিন কোটির বেশি মধ্য ও উচ্চবিত্ত মানুষের একটি বাজার’ ও ‘অলৌকিক উন্নয়নের বিস্ময়’ হিসেবে দেখে থাকেন। ব্যাপক উন্নয়নের জন্য আমাদের শক্তি হলো সামাজিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশের মানুষের আস্থা। আমার বাবা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত এবং শোষণহীন সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার সেই লক্ষ্যই আমাদেরকে ২০২১ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হওয়ার আত্মবিশ্বাস দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পোশাক খাতের বাইরে বাংলাদেশ জ্ঞাননির্ভর সমাজের পথে অগ্রসর হচ্ছে। গত বছর আমরা কোরিয়াতে ১২টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবট রপ্তানি করেছি। বাংলাদেশে তৈরি চারটি জাহাজ ভারতে এসেছে। সম্প্রতি রিলায়েন্স বাংলাদেশে তৈরি বিপুল পরিমাণ রেফ্রিজারেটর কিনেছে। বাংলাদেশে রয়েছে ছয় লাখ আইটি ফ্রিল্যান্সারের বিশাল গোষ্ঠী। তিনি বলেন, বাংলাদেশে দ্রুত গতিতে নগরায়ণ হচ্ছে। ২০৩০ সালে দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৮ শতাংশই শহরে বসবাস করবে। যাদের অধিকাংশই হবে তরুণ, পরিশ্রমী এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। দ্রুত নগরায়ণের কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়বে এবং তিন কোটির বেশি মধ্যবিত্তের বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থেই একটি বড় বাজার।
শেখ হাসিনা বলেন, চলতি বছর আমরা রেকর্ড ৮ দশমিক ১ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। আমরা প্রবৃদ্ধি অর্জনে দুই সংখ্যার কাছাকাছি রয়েছি। ২০০৯ সালের পর বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ১৮৮ শতাংশ বেড়েছে। আমাদের মাথাপিছু আয় দুই হাজার ডলারের কাছাকাছি। তিনি বলেন, আমাদের কৃষিখাত এখন আর দুর্বল নয়। কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি আমরা এখন ধান উত্পাদনে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্ দেশ, পাট উত্পাদনে দ্বিতীয়, আম উত্পাদনে চতুর্থ, সবজি উত্পাদনে পঞ্চম এবং মত্স্য উত্পাদনে চতুর্থ। বিভিন্ন শস্য ও ফলের জীবনরহস্য উন্মোচনের মাধ্যমে এ খাতে আমরা আরো এগিয়ে চলেছি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় উদার বিনিয়োগের অন্যতম ক্ষেত্র। বিদেশি বিনিয়োগের আইনি সুরক্ষা, বছরে বড় ধরনের প্রণোদনা, যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কছাড়, সহজে ব্যবসা ছাড়া, পুরো মুনাফা এবং মূলধন বিদেশে নেওয়ার সুবিধা দেওয়া হয়। তিনি বলেন, আমরা বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে নিরবচ্ছিন্ন সুবিধা ও সেবা নিশ্চিত করে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করেছি। এর মধ্যে ১২টি অঞ্চল কাজ শুরু করেছে। দুটি অঞ্চলকে ভারতের বিনিয়োগকারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠানের জন্য বেশ কয়েকটি হাই-টেক পার্কও প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত বছর এইচএসবিসি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৬তম বৃহত্ অর্থনীতি হবে। এক্ষেত্রে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। একটি হচ্ছে, আমাদের উন্মুক্ত সমাজ ব্যবস্থা, ধর্মীয় সম্প্রীতি, উদার মূল্যবোধ ও ধর্ম নিরপেক্ষ সংস্কৃতি। অন্যটি হচ্ছে, আমাদের জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশই তরুণ। তারা দক্ষ, প্রযুক্তির ব্যবহারে সাবলীল এবং প্রতিযোগিতামূলক কাজে যুক্ত হতে প্রস্তুত। বাংলাদেশ আপনাদেরকে একটি স্থিতিশীল ও মানবিক রাষ্ট্রের প্রস্তাব দিচ্ছে, যার নেতৃত্ব সব সময় ক্রিয়াশীল এবং দায়িত্বশীল।
রাতে প্রধানমন্ত্রী তার সম্মানে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মৈত্রী হল ও বাংলাদেশ হাউজে আয়োজিত অভ্যর্থনা ও নৈশভোজে যোগ দেন। টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর শেখ হাসিনা তার প্রথম ভারত সফরে আগামীকাল শনিবার নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করবেন। তিনি একই দিন ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ভবনে সৌজন্য সাক্ষাত্ করবেন।