মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডের একটি সরু গলি। গলিটির প্রায় সবগুলো বাড়িই ৫ থেকে ৭ তলা। পায়ে হেঁটে গলিটির মাঝামাঝি পর্যন্ত গেলেই একটি বাড়ি (টি/৩৪) দেখে চোখ আটকে যাবে। কারণ, ৫-৭ তলা ভবনগুলোর মাঝখানে পুরোনো এই দোতলা বাড়িটি অনেকটাই বেমানান। বাড়িটির বাইরে টু-লেট লেখা। প্রবেশদ্বারে লোহার গেট, তার ভেতরে কাঠের দরজা। পাশেই একটি জানালা। দোতলায় একটি বারান্দা, বারান্দার দুইপাশে অনেকটা জায়গা নীল পর্দা দিয়ে ঢাকা। বারান্দায় শুকাতে দেওয়া হয়েছে কিছু জামা কাপড়। বাড়িতে কারা থাকেন জানেন না নূরজাহান রোডের এই গলির বাসিন্দাদের। তবে গত সোমবারের পর থেকে নূরজাহান রোডের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে এই বাড়ির পুরনো মালিক আর তার ছেলেদের নিয়ে বেশ গুঞ্জন চলছে। পত্রিকা ও টিভির পর্দায় খবরটা দেখার পর এই গলির অনেকেই অবাক হয়েছে। কারণ বাংলাদেশে অনলাইন ক্যাসিনোর কান্ট্রি হেড হিসেবে যার নাম এসেছে খবরে, সেই সেলিম প্রধানের শৈশব-কৈশোর কেটেছে এই বাড়িতে।
জন্ম-বেড়ে ওঠা এই এলাকায় হলেও, হঠাত্ বড়লোক বনে যাবার পর নূরজাহান রোড ছেড়ে যায় সেলিমরা। এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগও পুরোপুরিভাবে বন্ধ করে দেয় তারা। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ সময়, সেলিমদের পরিবারের কথা ভুলেও গেছেন তারা। কিন্তু হঠাত্ সেলিমকে গ্রেফতারের খবরে এলাকাবাসীর মধ্যে নতুন করে গুঞ্জন শুরু হয়েছে এই পরিবারটিকে নিয়ে। তার বাবার ছিল দুটি বেবিট্যাক্সি। এটাই পরিবারের আয়ের উত্স ছিল। এখন সেলিম প্রধান কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক। সেলিম প্রধান বাংলাদেশে প্রথম বেসরকারি খাতে সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস তৈরি করেন। সেলিম প্রধানের জাপান-বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড পেপারসে বিভিন্ন ব্যাংকের চেক বই ছাপা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অফিসের রেভিনিউ স্টাম্পসহ নথিপত্র ছাপানো হয়। তবে পর্দার অন্তরালে এই প্রিন্টিং থেকে জাল টাকা ছাপা হতো। বাইরে স্ট্যাম্পও বিক্রি করা হতো। ভাইয়ের শ্বশুর ধনাঢ্য জাপানি নাগরিককে হত্যার অভিযোগও রয়েছে সেলিমের বিরুদ্ধে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকারোক্তি এবং অনুসন্ধানে জানা গেছে, সেলিমের বাবার নাম হান্নান প্রধান। তিনি ছিলেন দুটি বেবিট্যাক্সির (এক ধরনের অটোরিকশা) মালিক। হান্নানের এই দুইটি বাহনই ছিল পরিবারটির একমাত্র আয়ের উত্স। বেবিট্যাক্সি দুটোর আয়ের টাকা দিয়ে এক সময় হান্নান একটি মিনি বাস কিনেন। দরিদ্রতা কাটিয়ে অনেকটা স্বচ্ছল অবস্থায় ফিরে আসে পরিবারটি। হান্নান প্রধানের তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। ছেলেদের মধ্যে সবচেয়ে বড় আলম প্রধান, মেজো সেলিম প্রধান এবং সবার ছোট নাদিম প্রধান। আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হওয়ার পর নিজের জমানো টাকা দিয়ে প্রথমে বড় ছেলে আলম প্রধানকে জাপানে পাঠান হান্নান। জাপানে থাকাকালীন সেখানকার এক ধনাঢ্য ব্যক্তির একমাত্র মেয়েকে বিয়ে করেন আলম, এতে ভাগ্য খুলে যায় পুরো প্রধান পরিবারের। আলমের শ্বশুর মারা যাওয়ার পর জাপানে তার পুরো সম্পত্তির দায়িত্ব এসে পড়ে আলমের কাঁধে। এরপর আলম জাপান-বাংলাদেশ গ্রুপ (জেবি গ্রুপ) নামে একটি বিশাল কোম্পানি প্রতিষ্ঠান করে। বাংলাদেশ থেকে জাপানে নিয়ে যায় ছোট ভাই সেলিম প্রধানকে। ভাইয়ের শ্বশুর বাংলাদেশে আসেন। তার সম্মানে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। ওই অনুষ্ঠানের জাপানের ধন্যাঢ্য ব্যক্তি আলমের শ্বশুর মারা যান। অভিযোগ আছে, খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে আলমের শ্বশুরকে হত্যা করা হয় এবং হত্যার পর তারা উল্লাসও করেন।
সেলিম প্রধানরা তিন ভাইয়ের কেউই উচ্চশিক্ষিত নয়। ছোটবেলা থেকেই জুয়া খেলার প্রতি প্রবল আকর্ষণ ছিল সেলিমের। সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদের শাসনামলে গড়া একটি কমিউনিটি সেন্টার ছিল নূরজাহান রোডে। কৈশোরে ওই কমিউনিটি সেন্টারে নিয়মিত জুয়ার আসরে বসতো সেলিম। বড় ভাই আলমের হাত ধরে জাপানে যাওয়ার পরও জুয়ার নেশা ত্যাগ করতে পারেনি সেলিম। যে কারণে জাপানেও সে গ্যাম্বলিংয়ে জড়িয়ে পড়ে। জড়ায় ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির মতো অপরাধেও। ইন্টারপোল তার বিরুদ্ধে রেড এলার্ট জারি করে। রেড নোটিশ পাওয়ার পর গোপনে বাংলাদেশে ফিরে আসে সেলিম। এরপর দেশে থেকে জাপান-বাংলাদেশ গ্রুপের দায়িত্ব নেয় নিজের কাঁধে। কোম্পানিটির ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান চেয়ারম্যান এই সেলিম প্রধান। জাপান বাংলাদেশ গ্রুপের অধীনে ১১টি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেগুলো হলো- জেনি সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড পেপারস, প্রধান বিউটি কেয়ার, জেবি ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, জেবি এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট, এসপি ফিশিং নেট, জেবি ট্রেডিং কর্পোরেশন, জেবি সিকিউরিটি সার্ভিস, জেবি টোনার ম্যানুফেকচারিং, জেবি এন্টারটেনমেন্ট, জেবি আইটি সস্যুশন ও এসেট ডেভেলপমেন্ট। জেবি গ্রুপ ছাড়াও সেলিম প্রধানের আরো একটি কোম্পানি রয়েছে প্রধান গ্রুপ নামে। এই প্রতিষ্ঠানের অধীনে রয়েছে আরো ৫টি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। সেগুলো হলো- পি২৪ ল ফার্ম, পি২৪ গেমিং, জেবিএসপিপিএল, প্রধান হাউজ ও এইউ এন্টারটেইনমেন্ট। এর মধ্যে পি২৪ গেমিং প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমেই অনলাইনে ক্যাসিনো পরিচালনা করতেন সেলিম প্রধান। আর এই কাজে যাবতীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা করতো তারই মালিকানাধীন আইটি প্রতিষ্ঠান জেবি আইটি সল্যুশন। অন্যদিকে অভিযোগ রয়েছে প্রধান বিউটি কেয়ারের মাধ্যমে পরিচালিত হতো স্পা ব্যবসা। আর এই স্পা ব্যবসার আড়ালে সেলিম প্রধান দেশের বিভিন্ন স্পা সেন্টার, বিউটি পার্লার ও হোটেলগুলোতে ভিআইপিদের কাছে তরুণী সরবরাহ করতেন।
এক সময় প্রধান পরিবার গুলশানে চলে যায়। বড় ভাই আলমের কল্যাণে পরিবারের ছোট ছেলে নাদিমও ব্যবসায়ী বনে যান। রাজধানীতে একটি বড় গাড়ির শো-রুম দেয় নাদিম। পরিবারের সবাই পৈত্রিক এলাকা ছেড়ে গেলেও নাদিম প্রায়ই নূরজাহান রোডে আসতো। সে প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন মডেলের গাড়ি নিয়ে এলাকায় আসতো, মাঠে বসে আড্ডা দিত আবার রাতে চলে যেত। খুবই বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাত নাদিম, যে কারণে একদিন সড়ক দুর্ঘটনায় নাদিমের মৃত্যু হয়। বিএনপির লোকদের সঙ্গে সেলিম প্রধানের যেমন সখ্যতা রয়েছে, তেমনি আওয়ামী লীগের দুই প্রভাবশালী নেতা তার ব্যবসায়িক পার্টনার। ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় থেকে কোটি কোটি বিদেশে পাচার করেছেন সেলিম প্রধান। সেলিম প্রধানের আশ্রয়-প্রশ্রয় দাতাদের নাম গোয়েন্দাদের হাতে রয়েছে।