অন্ধকার ক্রমশ ফিকে হইতেছে

আফ্রিকায়ও কোনো এক সময়ে আসিয়া মত প্রকাশ করিবার মতো পরিবেশ তৈরি হইতে পারে—মাত্র কিছুদিন পূর্বেও ইহা যেন কল্পনার বাহিরে ছিল। সর্বশেষ গত ১৫ সেপ্টেম্বর প্রথম দফায় প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইয়াছে তিউনিসিয়ায়। উহার দ্বিতীয় দফায় ভোট হইবে আগামী ১৩ অক্টোবর। ক্রমশ ইহাই প্রতীয়মান হইতেছে যে আফ্রিকা মহাদেশের সর্বত্রই মত প্রকাশের নূতন হাওয়া অল্প অল্প করিয়া বহিলেও প্রবেশ করিতেছে নানা ফাঁকফোকর দিয়া। 

প্রবাদে আছে—তমসো মা জ্যোতির্গময়। অর্থাত্, অন্ধকার হইতে আমাকে আলোর পথে লইয়া আসো। শতকের পর শতক ধরিয়া আফ্রিকা মহাদেশকে একরকম গহিন অন্ধকারে ডুবাইয়া রাখা হইয়াছিল। দুর্গম ও নিকৃষ্ট মহাদেশ হিসাবে যেই আফ্রিকাকে সভ্যজগত্ সবচাইতে তুচ্ছ জ্ঞান করিত, সেই মহাদেশটি প্রাকৃতিক সম্পদের দিক হইতে সবচাইতে সমৃদ্ধ। বিজ্ঞান বলিয়া থাকে, আধুনিক মানুষ তথা হোমো স্যাপিয়েন্সের উত্পত্তি হইয়াছিল এই মহাদেশেই। একসময় আধুনিক মানুষ আফ্রিকা হইতে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল সারা বিশ্বে। সেই হিসাবে পাহাড় ও অরণ্যঘেরা আফ্রিকা মহাদেশকে সভ্যতা বিকাশের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসাবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বৃহত্ পরাশক্তিরা আফ্রিকাকে লইয়া খেলিয়াছে নিজেদের মতো করিয়া। ইতিহাস বলে, বিগত ৫০০ বত্সরে ইউরোপীয় বণিক ও ঔপনিবেশিকেরা আফ্রিকার উপর নির্মম আধিপত্য বিস্তার করিয়াছে। লক্ষ লক্ষ কালো আফ্রিকানকে দাস হিসাবে উত্তর আমেরিকায়, দক্ষিণ আমেরিকায় ও ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে পাঠাইয়াছে ইউরোপীয় বণিকেরা। আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদকে ব্যবহার করিয়াছে নিজেদের প্রয়োজনমতো। এই সকল কারণে বিংশ শতাব্দীতে আসিয়াও আফ্রিকা হইয়া উঠিয়াছিল দারিদ্র্য, বুভুক্ষা, অপশাসনসহ যুদ্ধ-সংঘাতের চাঁদমারি। অ্যাঙ্গোলা হইতে সোমালিয়া, রুয়ান্ডা হইতে জিম্বাবুয়ে—সর্বত্র সেই একই চিত্র। প্রায় শত কোটি মানুষের মহাদেশ আফ্রিকার মোট রাষ্ট্রসংখ্যা ৫৪, যাহার মধ্যে একসময় একমাত্র মরিশাসেই ছিল মত প্রকাশের অধিকার। তবে তিউনিসিয়া, সেনেগাল, কেপভার্দ, ঘানা, বেনিন, সাও টেপা ও প্রিন্সিপ, নামিবিয়া, জাম্বিয়া, বতসোয়ানা, দক্ষিণ আফ্রিকা, লেসোথো, ক্রিচেলিস ও সোয়াজিল্যান্ডে অল্পস্বল্প করিয়া ফুটিয়া উঠিতেছিল মত প্রকাশের আলোকধারা। মিশ্ররূপ রহিয়াছে মরক্কো, মৌরিতানিয়া, গিনি, সিয়েরা লিওন, লাইবেরিয়া, কোতে দ্য আইভরি, লিবিয়া, মিশর, নাইজার, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ সুদান, উগান্ডা, কেনিয়া, তাঞ্জানিয়া, মালাবি ও মোজাম্বিক, মাদাগাস্কার, কমোরস, জিম্বাবুয়ে, অ্যাঙ্গোলা, কঙ্গো, রুয়ান্ডা, কঙ্গো ব্রাজাভিল, গ্যাবন, ক্যামেরুন, আলজিরিয়া, মালি প্রভৃতি দেশে।

মনে রাখিতে হইবে, আফ্রিকার ৫৪টি দেশের মধ্যে ৫৩টিতেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এখনো রহিয়াছে প্রধান পরাশক্তির সামরিক উপস্থিতি। আফ্রিকায় প্রতি বত্সর প্রায় সাড়ে তিন হাজার মহড়া কিংবা অন্যান্য সামরিক তত্পরতা চালাইয়া থাকে পরাশক্তিরা। এইখানে ছোটো-বড়ো মিলাইয়া প্রায় ৫০টি সামরিক ঘাঁটি রহিয়াছে পরাশক্তিদের। কিন্তু যাহা তৃতীয় বিশ্বের জন্য অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ, তাহা হইল—পরাশক্তিধরদের সহিত এত ধরনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত-যুদ্ধ-ষড়যন্ত্রের পরও এই অন্ধকার মহাদেশটির গহিন আঁধার ক্রমশ ফিকে হইতেছে। হয়তো এখনো যোজন পথ পাড়ি দিতে হইবে, কিন্তু নানা রকমের ত্রুটিবিচ্যুতির মধ্য দিয়াও এই অঞ্চলে মত প্রকাশের যেই বীজদানা রোপিত হইতেছে, তাহার গুরুত্ব সীমাহীন।