অণুগল্প

তুলতুলি বয়সীনিবাস

 

মা লাঠি-ভর দিয়ে হাঁটেন। একটু হেঁটেই ক্লান্ত হয়ে যান। ক্লান্তি দূর করতে এইমাত্র নিজের বিছানায় এসে গা এলিয়ে শুয়ে পড়েছেন। তাঁর পুত্রবধূ এলিনা হোসেন এসে ডেকে তুলল, মা একটু ওঠেন। বিছানা ঝাড় দেব।

: কী কও বৌমা, তুমি ক্যান ঝাড় দিবা? কাজের মাইয়াডা কই? আয়েশা কই গেল?

: আয়েশাকে লাগবে না মা, এখন থেকে আপনাকে আমিই টেক কেয়ার করব।

মা বিছানা থেকে উঠলে চাদর সরিয়ে নতুন চাদর পাতে এলিনা। আনন্দে একটু দূরে গিয়ে মা তাঁর ছেলে ওয়াসিমকে ফোন করেন। ওয়াসিম বিদেশে থাকে। এখন সেখানে মধ্যরাত। ফোন রিসিভ করে বলে, কী খবর মা, এত রাতে ফোন দিছো, কোনো সমস্যা?

: হ-রে বাবা, সমস্যা। বিরাট সমস্যা। ফোন করছি আনন্দে। বৌমা বলছে এখন থিকা নাকি সে আমারে টেক কেয়ার করবি। এত বড় একটা খুশির খবর তোরে না দিয়ে থাকি কেমনে ক। যে আমার কথা শুনবারই পারে না, আমারে দেখবার পারে না, সে আমার বিছানা ঝাড় দিচ্ছে—।

: ঠিক আছে মা, আমি ঘুমাই। কাল তোমার সাথে কথা বলব।

ওয়াসিম যেন মায়ের কথায় গুরুত্ব দিল না। মা ঘরে ঢুকে দেখে এলিনা সুন্দর একটি চাদর পেতেছে। বালিশের কাভার খুলে নতুন কাভার ঢোকাচ্ছে। মা আবার বাইরে গিয়ে ফোন করলেন। ফোন করতে বেগ পেতে হয় না। ওয়াসিম এগারো হাজার টাকা দিয়ে ফোনটি কিনে দিয়েছে। স্ক্রিনে ওয়াসিমের ছবি সেট করা আছে, ছবিতে একটা টাচ করলেই কল চলে যায়। ওয়াসিম এবার একটু বিরক্ত হয়ে বলল, হ্যাঁ মা, আবার কী হলো?

: বৌমা তো আমার জন্যি নতুন চাদর পাততিছে। তুই কি তারে বকা-টকা দিছিস নাকি? খবরদার বকবি নে—। ইচ্ছে হলি যত্ন-আত্তি করবি সে, না-হলি করবি নে। নতুন চাদর পাতা দেইখে আমার খুব ভালো লাগতিছে।

: ঠিক আছে মা, এখন ঘুমাই। সকালে উঠতে হবে।

মা ফোন রেখে তাঁর ঘরে গিয়ে খাটে বসতে গেলে এলিনা বলল, এখন নয় মা, আরো কাজ আছে। আপনি একটুক্ষণ সোফায় গিয়ে বসুন।

মা মিষ্টি মিষ্টি হাসতে হাসতে সোফায় গিয়ে বসেন।

 

কয়েকদিন পর ওয়াসিম তার স্ত্রী এলিনাকে ফোন দেয়। বলে, কী ব্যাপার এলিনা বলো তো—মা-র ফোন বন্ধ পাচ্ছি। তুমিও কাল ফোন ধরলে না। মা-র শরীর ভালো তো?

: সব ভালো। মা-র ফোনটাও আমার কাছে। মা এখন আগের থেকে অনেক বেটার ফিল করছে।

: তার মানে?

: মাকে আমাদের তুলতুলি বয়সীনিবাসে রেখে এসেছি।

: এসব কী বলছ?

: আ-রে, তুমি জানো না। জানবে কী করে? তোমাকে তো বলাই হয়নি—আমরা কয়েক বন্ধু মিলে তুলতুলি বয়সীনিবাস নামে একটি ওল্ডহোম তৈরি করেছি। এটা ঠিক ওল্ডহোমের মতো নয়, কিছুটা নতুন আঙ্গিকে। ঘরোয়া পরিবেশে তুলতুলে নরম সেবা—।

: রাখো তোমার সেবা?

: আহা, রেগে যাচ্ছ কেন? শোনো—ওখানে মা-র যত্ন-আত্তির কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।

: যত্ন-আত্তি করার জন্যে আর লোক পেলে না?

: লোক পাব কোথায়? নতুন একটা প্রতিষ্ঠানে হুট করে কি কাস্টমার পাওয়া যায়?

এবার ওয়াসিমের মাথা বিগড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত মাকে ওরা কাস্টমার বানিয়ে ছেড়েছে? এলিনা বলে যায়, তাছাড়া ওখানে আমি বেশ কিছু টাকা ডোনেশন দিয়েছি। উশুল করবারও একটা ব্যাপার আছে না? এসব ছোটোখাটো ব্যাপার নিয়ে তুমি মাথা ঘামাচ্ছ কেন?

: তোমার মাথা যে পুরোটাই গেছে তা বুঝতে পারছি।

: নিজের মাথাটা ঠান্ডা রাখো। জানোই তো, আমার ছোট ভাইটা এবার এইচএসসি পাস করেছে। ঢাকায় এসেছে ভর্তি হবে বলে। এখানে থাকবে কোথায়? তাই গেস্টরুমটা নতুন করে সাজালাম।