পুলিশ হত্যা করেই ‘ডন’ হয় জিসান

বিদেশে বসেই রাজধানীর আন্ডার-ওয়ার্ল্ড কাঁপিয়ে দিতেন শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ মন্টি ওরফে জিসান। প্রায় ১৫ বছর আত্মগোপন করার পর এখন দুবাই পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন ঢাকার এই ‘ডন’ জিসান। দুবাইয়ে গ্রেফতার হওয়ার খবরটি ছিল ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’।

দুবাই পুলিশের জালে বন্দি হওয়ার কৌশলটিও ছিল পুলিশ সদর দপ্তরের সর্বোচ্চ পর্যায়ের চেষ্টার ফসল। জিসানের নাম পরিচয় এবং অবস্থান নিশ্চিত হতে র্যাব ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ দুই সপ্তাহ ধরে কাজ করেছে। বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সার্বিক বিষয়টি মনিটরিং করেছে পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি)।

এনসিবি’র সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) মহিউল ইসলাম বলেন, জিসানের ব্যাপারে দীর্ঘদিন ধরে পুলিশ সদর দপ্তর খোঁজ খবর নিচ্ছিল। সর্বশেষ জিসান আলী আকবর চৌধুরী নাম দিয়ে ভারতের পাসপোর্ট নিয়েছিলেন সে বিষয়েও আমাদের কাছে তথ্য ছিল। আমরা জিসানের পুরাতন মামলার তথ্য দুবাই পুলিশের কাছে দিয়েছিলাম। তারা তাকে আটক করে তার ছবি প্রথমে আমাদের কাছে দেয়। এরপর সেসব ছবি যাচাই বাছাই করে আমরা নিশ্চিত হই যে আলী আকবর চৌধুরী নামে পাসপোর্টধারী ব্যক্তিই জিসান। তার কাছে ডোমিনিকান রিপাবলিকের পাসপোর্টও পাওয়া গেছে। তার ব্যাপারে সব নথিপত্র তৈরি করা হচেছ। তাকে দেশে ফেরত আনার জন্য আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এনসিবি সূত্র জানায়, দুবাইয়ে জিসানের ব্যবহূত পাসপোর্টে নাম উল্লে­খ করা হয়েছে আলী আকবর চৌধুরী। ভারতীয় নাগরিক হিসেবে ঠিকানা দেখানো হয়েছে সারদা পল্ল­ী, ঘানাইলা, মালুগ্রাম শিলচর, চাষার, আসাম। বাবার নাম হাবিবুর রহমান চৌধুরী। মায়ের নাম শাফিতুন্নেছা চৌধুরী। আর স্ত্রীর নামের স্থানে উলে­খ করা হয়েছে রিনাজ বেগম চৌধুরী। পাসপোর্ট ইস্যুর স্থান দুবাই হিসেবে উল্লে­খ রয়েছে। ২০০৯ সালের ৭ জুন প্রদান করা পাসপোর্টটির মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ২০১৯ সালের ৬ জুন। মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার পর ফের ভারতীয় পাসপোর্টটি ১০ বছরের মেয়াদে নবায়ন করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, সারাদেশে টেন্ডারবাজি ও মতিঝিল ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনো চালানোর ঘটনায় যুবলীগের জি কে শামীম, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও শফিকুল আলম ওরফে ফিরোজ আলম গ্রেফতার হওয়ার পরই এই আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন হিসাবে জিসানের নাম জানতে পারে র্যাব ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এই দুই সংস্থার কাছে এই তিনজন রিমান্ডে থাকার সময় পৃথকভাবে জিসানের সঙ্গে কথা বলেন। ম্যাসেঞ্জার, ভাইবার ও হোয়াটসআপের মাধ্যমে জিসানের সঙ্গে কথা বলার তথ্য পর্যবেক্ষণ করে র্যাব ও ডিবি। এসব তথ্য পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবিকে দেওয়া হয়। এনসিবি আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তা নিয়ে জিসানকে গ্রেফতার করে।

স্কুল শিক্ষিকার ছেলে হয়ে গেল ডন

রাজধানীর রামপুরা টিভি স্টেশনের পিছনে ৩৩৩, পশ্চিম রামপুরার দোতলা বাড়িতে বসবাস করতেন জিসান। তার মা মগবাজারের একটি স্কুলের শিক্ষিকা। ১৯৯৭ সালের দিকে রামপুরায় গার্মেন্টেসের ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রন করতে গিয়ে জিসানের পরিচয় হয় আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে। তার ছোট ভাই শামীম প্রথম দিকে এই ঝুট ব্যবসা শুরু করেন। ওই সময় রামপুরা ও মালিবাগ এলাকায় ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের পর বেশ কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। জিসান ও তার ছোট ভাই শামীম এই ছিনতাইয়ে নেতৃত্ব দিতেন। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় রামপুরার শাহাজাদা গ্রুপ। জিসানের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল যুবদল নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার সঙ্গে। খালেদ ছিলেন মতিঝিল ক্লাবপাড়ায় বিশেষ করে আরামবাগ ক্লাবে জুয়ার আসরের নিয়ন্ত্রক। সেই সূত্র ধরে জিসানের যাতায়াত হয় ক্লাবপাড়ায়।

২০০০ সালের শেষের দিকে আরামবাগ ক্লাবে জুয়ার টাকার চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। জিসান গ্রুপের গুলিতে বুলু ওরফে খোকন নামে একজন নিহত হন। ওই ঘটনায় মামলা দায়েরের পর ডিবি পুলিশের হাতে জিসান গ্রেফতার হন। কিন্তু গ্রেফতারের মাস তিনেক পর জামিনে জিসান মুক্ত হন। এরপর তাকে আর পিছনে তাকাতে হয়নি। মগবাজার, মালিবাগ, রামপুরা, খিলগাঁও, সবুজবাগ, মতিঝিল, বাড্ডা এবং কাওরানবাজারের শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ হয় জিসানের। বাড্ডার মেহেদী গ্রুপ, ডালিম-রবিন গ্রুপ এবং কাওরানবাজারের নরোত্তম সাহা ওরফে আশিক গ্রুপ ছিল জিসানের সমবয়সী।

ওই সময় আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেভেন স্টার ও ফাইভ স্টার গ্রুপকে সবাই সমীহ করে চলত। মালিবাগের মোল্লা মাসুদ, শুব্রত বাইন ওরফে ত্রিমতি বাইন, ইস্কাটনের লিয়াকত, মগবাজারের টিক্কা, আরমান, কাওরানবাজারের পিচ্চি হান্নান, কাফরুলের কালা জাহাঙ্গীর, তাজ, পুরান ঢাকার ডাকাত শহীদ এবং রাজাবাজার, মোহাম্মদপুর কেন্দ্রিক শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর হাতে রাজধানীর একেকটি এলাকা নিয়ন্ত্রনে ছিল। ২০০১ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের প্রকাশিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় জিসানের নাম ছিল না। ফলে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা প্রকাশের পর আন্ডারওয়ার্ল্ডে জিসানের অবস্থান স্থায়ী হয়।

সানরাইজ হোটেল দুই পুলিশকে হত্যা

২০০২ সালে জিসান মতিঝিলের খালেদের সঙ্গে টেন্ডারবাজি করতে থাকেন। খালেদ ছিলেন তত্কালীন পূর্ত মন্ত্রী মির্জা আব্বাসের ছোট ভাই মির্জা খোকনের বন্ধু। ফলে গণপূর্তে জি কে শামীম ও খালেদ এককভাবে টেন্ডারবাজি করে যান। টেন্ডারবাজিতে ভয়ভীতি দেখাতে জিসান গ্রুপ ও শাহাজাদা গ্রুপ অস্ত্রবাজি করত। এই দুই গ্রুপ রামপুরা ও মালিবাগ এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিত। ২০০৩ সালের ১৫ মে রাতে মালিবাগের সানরাইজ হোটেলে ১৫ লাখ টাকা ছিনতাই করতে যায় জিসান গ্রুপ।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তত্কালীন এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সোর্স বাবুল জানায় যে একটা গ্রুপ সানরাইজ হোটেলে অস্ত্র বিক্রি করতে আসবে। পুলিশ অস্ত্র ক্রেতা হিসাবে সেজে গিয়ে তাদেরকে গ্রেফতার করতে পারবে।

আরও পড়ুন: দেশ ছেড়েছেন অর্ধ শতাধিক ব্যক্তি

২০০৪ সালে ডিবি পুলিশ নিশ্চিত হয় যে জিসান ভারতে আত্মগোপন করেছেন। ২০০৫ সালে ডিবি পুলিশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন থেকে ইলিয়াস নামে জিসানের এক শিষ্যকে আটক করে। ইলিয়াস সানরাইজ হোটেলে পুলিশকে গুলি করেছিলেন। পরবর্তীতে ইলিয়াস ডিবি পুলিশের বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।

পুলিশ হত্যার বিচার হয়নি

দুই পুলিশ হত্যা মামলার বিচারকাজ ১৬ বছরেও শেষ হয়নি। ওই ঘটনায় ডিবির তত্কালীন ইন্সপেক্টর জিএম এনামুল হক মামলাটি দায়ের করেন। মামলাটি তদন্ত করে ২০০৪ সালে ডিবির তত্কালীন ইন্সপেক্টর নূর মোহাম্মদ আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। ২০০৭ সালে আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে বিচার শুরু করে আদালত। চার্জগঠনের পর ১২ বছরে মাত্র ১২ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। মামলাটির বিচার কবে শেষ হবে সে বিষয়ে সন্দিহান সংশি­ষ্টরা।

ইত্তেফাক/কেকে