৭ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই, তিন প্রকল্প উদ্বোধন

ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহার করতে পারবে ভারত

ত্রিপুরায় সাবরুম শহরে পানীয় জল সরবরাহ প্রকল্পে ফেনী নদী থেকে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করতে পারবে ভারত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি সফরে এই বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং ভারতের জলশক্তি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে এই এমওইউ সই হয়। তবে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির ব্যাপারে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। দ্রুত চুক্তি সইয়ে ভারত সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে আশ্বস্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মিয়ানমারের বাস্তচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রচেষ্টার প্রশংসা করে মোদি বলেছেন, শিগগিরই দেশের পক্ষ থেকে আরো মানবিক সহায়তা কক্সবাজারস্থ রোহিঙ্গা শিবিরে পৌঁছবে। একই সঙ্গে আসামের নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসির কোনো প্রভাব বাংলাদেশে পড়বে না বলে জানিয়েছেন তিনি।

গতকাল শনিবার নয়াদিল্লিতে হায়দ্রাবাদ হাউজে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে নরেন্দ্র মোদি এসব আশ্বাস দেন। সকাল সাড়ে ১১টায় এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শুরুর আগে দুই নেতা কিছুক্ষণ একান্তে কথা বলেন। দুই নেতার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পরে উভয়ের উপস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে সাতটি এমওইউ ও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মধ্যে চারটি হচ্ছে এমওইউ, একটি স্ট্যান্টার্ড অপারেশন প্রসিডিউর (এসওপি), একটি চুক্তি এবং অপরটি একটি কর্মসূচির নবায়ন।

ত্রিপুরায় সাবরুম শহরে পানীয় জল সরবরাহ প্রকল্পে ফেনী নদী থেকে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার বিষয়ে একটি এমওইউ সই হয়েছে। এছাড়া সমুদ্র উপকূলে নজরদারি (কোস্টাল সারভেইলেন্স সিস্টেম-সিএসএস) বিষয়ে, হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা বিষয়ে এবং যুব উন্নয়নে বাংলাদেশের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং ভারতের যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার লক্ষ্যে অপর তিনটি এমওইউ সই হয়।

ভারতের পণ্য পরিবহনে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারবিষয়ক চুক্তিসম্পর্কিত একটি এসওপি (স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর) সই হয়েছে। ভারত থেকে নেওয়া ঋণের প্রকল্প বাস্তবায়নের (এলওসি) বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি বিষয়ে চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে। চুক্তি ও সমঝোতাপত্র বিনিময়ের পর শেখ হাসিনা ও মোদি যৌথভাবে তিনটি প্রকল্প উদ্বোধন করেন। এগুলো হলো—খুলনায় ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে ‘বাংলাদেশ-ভারত প্রফেশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট’, ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনে বিবেকানন্দ ভবন এবং বাংলাদেশ থেকে ত্রিপুরায় এলপিজি আমদানি প্রকল্প।

ভারত সরকারের সূত্র ইত্তেফাককে জানায়, নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে আসামের নাগরিকপঞ্জি ইস্যুটি উত্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় মোদি বলেন, আসামের নাগরিকপঞ্জি আদালতের একটি প্রক্রিয়া। এর কোনো প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়বে না। সূত্র জানায়, যোগাযোগের ক্ষেত্রে সকল চুক্তি ও ব্যবস্থা আঞ্চলিক সংযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি বড়ো পদক্ষেপ। আঞ্চলিক যোগাযোগ বড়ানোর প্রেক্ষিতে দুই প্রধানমন্ত্রী বিম্সটেক নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে সার্ক নিয়ে কোনো কথা হয়নি। 

প্রকল্পগুলো উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিগত এক দশকে আমাদের উভয় দেশের মধ্যে বিভিন্ন প্রথাগত সহযোগিতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন নতুন ও অপ্রচলিত খাত যেমন ব্লু ইকোনমি ও মেরিটাইম, পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার, মহাকাশ গবেষণা, ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথ রপ্তানি ও সাইবার সিকিউরিটি ইত্যাদি খাতে উভয় দেশ সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করেছে। এসব বহুমুখী ও বহুমাত্রিক সহযোগিতার ফলে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিশ্ববাসীর সামনে সু-প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। এই সহযোগিতার সম্পর্ক ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। বাংলাদেশের মুুক্তিযুদ্ধকালে ভারত সরকার ও জনগণের সর্বাত্মক সহযোগিতার কথা পরম কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি চিরদিনের জন্য একটি মাইল ফলক হয়ে থাকবে।

এলপিজি প্রকল্প নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এটা আমাদের উভয় দেশের বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় করবে বলে আমি মনে করি। এর ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যসমূহের জ্বালানি চাহিদা পূরণ অনেকাংশে সহজ হবে বলে আশা করছি।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, গত এক বছরে আমি ভিডিও লিংকের মাধ্যমে ৯টি প্রকল্পের উদ্বোধন করেছি। আজকে তিনটি প্রকল্প যোগ হয়ে এক ডজন যৌথ প্রকল্পের উদ্বোধন করলাম। এই প্রকল্পগুলোর উদ্দেশ্য আমাদের নাগরিক জীবনমানকে উন্নত করা। এটাই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মূলমন্ত্র। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে ভারত সব সময় গুরুত্ব দেয়। এই দুই বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীর মধ্যে সম্পর্ক বিশ্বের কাছে একটি সুন্দর উদাহরণ। আজকের পর, এই সম্পর্ক আরো নতুন উচ্চতায় আসীন হলো।

বাংলাদেশ থেকে ভারতে বাল্ক এলপিজি সরবরাহ প্রসঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এবং ভারত দুই দেশই এ থেকে লাভবান হবে কেননা এটি দুই দেশের জন্যই সমান সুবিধাজনক পরিস্থিতির নির্দেশ করে।

শীর্ষ বৈঠকের পর হায়দরাবাদ হাউজে শেখ হাসিনা তার সম্মানে দেওয়া ভারতের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যাহ্ন ভোজে অংশ নেন।

দুই নেতার বৈঠকের পর দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নরেন্দ্র মোদি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের উদারতার প্রশংসা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের জন্য ভারতের পক্ষ থেকে পঞ্চম ধাপের মানবিক সহায়তা পাঠানো হবে। ইতিমধ্যে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ২৫০টি ঘর বানানোর প্রথম প্রকল্প শেষ করেছে ভারত। এখন ঐ এলাকায় আরেকটি সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারত। রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা প্রদান করায় ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান প্রধানমন্ত্রী। দ্রুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবাসনে একমত পোষণ করেন।

শেখ হাসিনা তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়টি তুলে ধরলে নরেন্দ্র মোদি জানান, চুক্তিটি দ্রুত সম্পাদনে ভারতের সকল অংশীজনের সঙ্গে তার সরকার কাজ করছে। দুই দেশের পানি সম্পদ সচিব পর্যায়ের বৈঠকে ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন দুই নেতা। তারা উপকূলীয় বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচলের সম্ভাবনার ওপর জোর দিয়েছেন। দুই নেতা দুই দেশের মানুষে মানুষে সংযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাত্

গতকাল ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতি ভবনে সাক্ষাত্কালে রাষ্ট্রপতি রামনাথ বলেন, ভারত সব সময় বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। আমাদের সম্পর্ক ঐতিহাসিক, সময়ের পরীক্ষিত। দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক খুবই চমত্কার। আমরা একই সঙ্গে আমাদের অংশীদারিত্বের সোনালি অধ্যায় রচনা করছি। পারস্পরিক আস্থা ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে ভারত এই সম্পর্ককে আরো মজবুত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি আরো বলেন, উন্নয়নশীল দেশের জন্য বাংলাদেশ রোল মডেল। সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশের জিরো টলারেন্স নীতির প্রশংসা করেন রাষ্ট্রপতি কোবিন্দ। 

সম্পর্ক ‘আরো উচ্চতায়’ নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার জয়শঙ্করের

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে ‘আরো উচ্চতায়’ নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাত্ করে তিনি এই অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। বৈঠকের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমার এক টুইট বার্তায় বলেন, জয়শঙ্কর বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের বিষয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।