হাসান মাহমুদ রিপন
মুখোশচিত্র, বাংলার লোক কারুশিল্পের এক অনন্য অংশ। বাংলার সামাজিক ইতিহাসের মূল্যবান সম্পদও বটে। মুখোশচিত্র গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের সৃষ্টি। চরিত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত মুখোশ মুখে লাগিয়ে মঞ্চে অভিনয় ও পূজা-পার্বণে নৃত্য পরিবেশিত হয়। যে কোনো অনুষ্ঠানে নৃত্য-অভিনয়ের সঙ্গে মুখোশের আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে নানাভাবে মুখোশের আবির্ভাব ঘটে। গ্রামের বিভিন্ন মেলায় বা যাত্রানুষ্ঠানে, চৈত্রসংক্রান্তিতে নৃত্যের আয়োজনে সাজানো হয় নানা ধরনের মুখোশ দিয়ে। অনেক ধরনের মুখোশ আছে যেগুলোকে খেলনা জাতীয় মুখোশ বলা যেতে পারে। আবার অনেক মুখোশ আছে যা নৃত্য, অভিনয় এবং পূজা-পার্বণে ব্যবহার করা হয়। মুখোশচিত্রের প্রত্যেক শিল্পীই তাঁদের তৈরি মুখোশকে সামান্য রদবদল করে বিভিন্ন চরিত্র সৃষ্টি করেন। যেমন বাঘ, ভালুক, বানর, দেবদেবী ইত্যাদি।
বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই লোক কারুশিল্পে মুখোশের চল ছিল। ঢাকা, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, রাজশাহী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, যশোর, বগুড়া, রংপুর প্রভৃতি অঞ্চলে আজো কিছু কিছু মুখোশ কোনো রকম টিকে আছে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ লোক কারুশিল্প ফাউন্ডেশনে লোক কারুশিল্প মেলা ও লোকজ উত্সবগুলোসহ অন্যান্য মেলা পার্বণে মুখোশ পরিলক্ষিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্রছাত্রীরা বৈশাখের উত্সবে বিভিন্ন মুখোশচিত্র তৈরি করে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা সহকারে বাংলা বর্ষবরণ উদযাপন করে থাকে।
কাঠ, কাগজ, মাটি, বেত, শোলা ইত্যাদি উপকরণ দিয়ে মুখোশ তৈরি করা হয়। মুখোশ তৈরিতে লাল, নীল, হলুদ এবং কালো রং প্রধান। গ্রামাঞ্চলে মালাকার, পাল, কুমার, আচার্য এবং অন্যান্য শিল্পী মুখোশ তৈরি করে থাকেন। দেবদেবীর মুখাকৃতি এবং বিভিন্ন পশুপ্রাণীর মুখের ডাইস বা ছাপ দিয়ে পরে শিল্পীরা হাতে টিপে টিপে দেবদেবী কিংবা পশু আকৃতির মুখোশ তৈরি করেন। যেমন মুণ্ড মূর্তির মুখোশ, ওলাই চণ্ডীর মুখোশ, বড়াম চণ্ডীর মুখোশ, বড়খা গাজীর মুখোশ, ধর্ম ঠাকুরের মুখোশ, সত্য নারায়ণ সত্য পীরের মুখোশ, পীর গোড়া চাঁদের মুখোশ, ওলা বিবির মুখোশ, ভৈরবের মুখোশ, ঘাটু দেবতার মুখোশ, মানিক পীরের মুখোশ ইত্যাদি।
অন্যান্য শিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় মুখোশচিত্রশিল্প আস্তে আস্তে প্রাধান্য হারিয়ে ফেলেছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী মুখোশশিল্পটি লুপ্ত হতে চলেছে।
মুখোশচিত্রের শিল্পীরা এখন মুখোশচিত্রের পাশাপাশি তৈরি করেছেন শোলার আধুনিক কাজ এবং শখের হাঁড়িসহ অন্য কিছু। বাঙালির চিরায়ত বিভিন্ন উত্সব ছাড়া মুখোশচিত্রের ব্যবহার লক্ষ করা যায় না।