পাটশিল্পের সুসময় এখন এক সোনালি অতীত। একদা এই পাটশিল্পকে অবলম্বন করিয়াই কৃষিপ্রধান বাংলা অঞ্চলে গড়িয়া উঠিয়াছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণি। অর্থাত্ পাটশিল্প মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিয়াছে। এক সময় প্রধান রপ্তানিপণ্য হিসাবে পাটখাত থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হইত। পাটের গুরুত্ব এইজন্য বেশি যে, পাট হইতে সুতাসহ অন্যান্য পাটসামগ্রী উত্পাদিত হয়। বর্তমানে পৃথিবীতে গড়ে ১৯ লক্ষ হেক্টর জমিতে চাষ করিয়া পাট উত্পাদিত হয় ৩২ লক্ষ মেট্রিক টন। যাহার শতকরা ২৫ ভাগেরও বেশি অর্থাত্ ৮.৩৩ লক্ষ মেট্রিক টন বা পৃথিবীর মোট পাট উত্পাদনের ২৬.০২ শতাংশ উত্পাদিত হয় এই বাংলাদেশে। পাটের রং সোনালি এবং পাট ও পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি করিয়া বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা হয় বিধায় পাটকে বলা হয় ‘সোনালি আঁশ’। আমাদের দেশের পাটের বাজারকে কেন্দ্র করিয়া ১৯৫১ সালে নারায়ণগঞ্জে গড়িয়া উঠিয়াছিল আদমজী পাট কলের মতো বৃহত্ প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে বাংলাদেশে ২৬টি সরকারি ও ৭৬টি বেসরকারি পাটকল রহিয়াছে। যদিও এইগুলিতে এখন উত্পাদন হয় না। আবার অনেক পাটকল পুরাতন হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত উত্পাদন পাওয়া যায় না। ফলে উত্পাদন খরচ বেশি হয়। পাট ও পাটজাত দ্রব্যের উত্পাদন ও বিকাশের জন্য যে পরিমাণে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন তাহা আমরা এখন আর করিতে পারিতেছি না।
বর্তমানে পাটজাত পণ্যের বিপণনেও রহিয়াছে নানা সীমাবদ্ধতা। যেমন এক সংবাদে বলা হইয়াছে, খুলনার ৯ পাটকলের পণ্য রপ্তানি বন্ধ রহিয়াছে দুই বত্সর। আমাদের দেশের পাটজাত পণ্যের প্রধান বাজার হইল তুরস্ক। চীন, ভারত, ইরান, মিশর, ইন্দোনেশিয়া ও বেলজিয়ামে সুতা রপ্তানি হইলেও মোট রপ্তানির ৪০ শতাংশ যায় তুরস্কে। এখন ঐ ৯টি পাটকলের রপ্তানি কেন বন্ধ রহিয়াছে তাহা কর্তৃপক্ষকে তদন্ত করিয়া দেখিতে হইবে। কারণ ইহার ফলে সার্বিকভাবে খুলনায় পাটকলের উত্পাদন থামিয়া গিয়াছে। পাটকলগুলিতে অবিক্রীত পণ্যের মজুত বাড়িতেছে। বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত ৯ পাটকলে ৩০ হাজার মেট্রিক টন পাটজাত পণ্য মজুত রহিয়াছে। যাহার বাজার মূল্য পৌনে ৩০০ কোটি টাকা। ইহার মধ্যে কিছু কিছু অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রয় হইতেছে। বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) সূত্র জানায়, পাটকলগুলির কাছে পাট ব্যবসায়ীদের পাওনা রহিয়াছে ১৮৭ কোটি টাকা। অর্থের অভাবে মিলগুলি দীর্ঘদিন ধরিয়া পাট ব্যবসায়ীদের টাকা পরিশোধ করিতে পারিতেছে না। ফলে ব্যবসায়ীরা শিল্প উত্পাদন অব্যাহত রাখিবার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচা পাট সরবরাহ করিতে ব্যর্থ হইতেছে। ইহার পাশাপাশি, পণ্য বিক্রয় না হওয়ায় পাটকলগুলি শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন দিতে পারিতেছে না। বাকি পড়িয়াছে সাত সপ্তাহের মজুরি ও বেতনসহ ৩২ কোটি টাকা। এই অবস্থায় শ্রমিকরা পরিবার-পরিজন নিয়া অর্ধাহারে-অনাহারে দিন অতিবাহিত করিতেছে। এই অবস্থার আশু উত্তরণ কাম্য।
বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক ও পলিথিনজাত পণ্যের কুফল সম্পর্কে জনমত ও সচেতনতা তৈরি হইয়াছে। পলিথিন পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করে। পলিথিন ও প্লাস্টিকের এই সর্বনাশা প্রভাব হইতে মুক্তির পথ হইতে পারে পাটজাত পণ্যের ব্যাপক ব্যবহার। আমাদের আরো উদ্যমী হইয়া বিপণন কৌশল তৈরি করিতে হইবে, যাহাতে বিশ্বব্যাপী পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ে। ইহার সহিত দেশের অভ্যন্তরেও যাহাতে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়, সেইদিকে আমাদের সবিশেষ নজর দিতে হইবে।