অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রপ্তানি কমেছে আড়াই হাজার কোটি টাকা
g রিয়াদ হোসেন
রপ্তানিতে ভালো প্রবৃদ্ধি দিয়ে অর্থবছর শেষ করার পর হঠাত্ করেই গত দুই মাস থেকে ছন্দপতন দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বরেও রপ্তানি আয় বড়ো ধাক্কা খেয়েছে। আলোচ্য সময়ে রপ্তানি কমেছে পূর্বের অর্থবছরের জুলাইয়ের চেয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাবে দেখা গেছে, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রপ্তানি হয়েছে ৯৬৪ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ পণ্য। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ৯৯৪ কোটি ডলারের পণ্য। অর্থাত্ গত তিন মাসে রপ্তানি কমেছে ২৯ কোটি ২৬ লাখ ডলারের বা প্রায় ৩ শতাংশ। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে আলোচ্য সময়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রপ্তানি কম হয়েছে প্রায় ১১ শতাংশ।
রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই আসে গার্মেন্টস খাত থেকে। গত অর্থবছরে মোট রপ্তানির ৮৪ শতাংশেরও বেশি এসেছে এ খাত থেকে। তবে ইপিবির হিসাব অনুযায়ী, সম্প্রতি এ খাতের রপ্তানি আয়ে ধাক্কা লেগেছে। গত তিন মাসে গার্মেন্টস পণ্যের রপ্তানি না বেড়ে উলটো কমে গেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুরো রপ্তানি খাতে।
রপ্তানিকারকরা আরো শঙ্কার কথা শুনিয়েছেন। তারা বলছেন, আগামী দুই মাসেও গার্মেন্টস পণ্যের রপ্তানি প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়বে না।
নারায়ণগঞ্জের এমবি নিট ফ্যাশনের মালিক মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, তার কারখানার সক্ষমতার অর্ধেকই এখন অব্যবহূত রয়ে গেছে। এটি শঙ্কা তৈরি করেছে। সম্প্রতি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়া মোহাম্মদ হাতেম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, আগামী দুই মাসেও রপ্তানি কমতির দিকে থাকবে। অথচ এই সময়ে রপ্তানি বাড়ার কথা। রপ্তানি কমার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে কিছু ক্রয়াদেশ স্থানান্তর হয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ মায়ানমার, ভারত ও পাকিস্তানে যাচ্ছে। বিশেষত ওভেন পোশাকের অর্ডার যাচ্ছে মায়ানমারে আর নিট পোশাকের অর্ডার যাচ্ছে পাকিস্তান ও ভারতে। এর বাইরে কিছু অর্ডার চলে যাচ্ছে ভিয়েতনামে। এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, নতুন মজুরি বাস্তবায়ন ছাড়াও গ্যাস-বিদ্যুতের দর বৃদ্ধির কারণে আমাদের উত্পাদন খরচ বেড়েছে। অন্যদিকে প্রতিযোগী দেশগুলোর স্থানীয় মুদ্রা ডলারের বিপরীতে দুর্বল হওয়ায় তারা আমাদের চেয়ে প্রতিযোগিতামূলক দরে অর্ডার নিতে পারছে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী পোশাকের দরও কমতির দিকে। সব মিলিয়ে আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ বেড়ে যাচ্ছে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রপ্তানির জন্য ডলারের আলাদা মূল্য নির্ধারণসহ সরকারের নীতি সহায়তা চেয়েছেন তিনি।
গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছিল বাংলাদেশ। আলোচ্য সময়ে ৩ হাজার ৯০০ কোটি ডলার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রপ্তানি হয়েছে ৪ হাজার ৫৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ পণ্য। পূর্বের অর্থবছরের চেয়ে রপ্তানি বেড়েছিল ১০ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এছাড়া লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৪ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রপ্তানি কমেছিল তিন শতাংশ। চলতি অর্থবছর প্রায় পৌনে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে ৪ হাজার ৫৫০ কোটি ডলারের। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিই ছিল। তবে এর পর থেকেই উলটো পথে হাঁটতে শুরু করেছে রপ্তানি।
ইপিবি প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত তিন মাসে গার্মেন্টস রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। অন্যদিকে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কমেছে প্রায় ১২ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে ৯১০ কোটি ডলার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৮০৫ কোটি ৭৫ লাখ ডলারের। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি হয়েছিল ৮১৯ কোটি ডলারের। এছাড়া গার্মেন্টস প্রায় সব খাতই রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে সমর্থ হয়নি। এছাড়া গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে রপ্তানি কমে গেছে। গার্মেন্টস ছাড়াও রপ্তানি কমার তালিকায় রয়েছে হিমায়িত খাদ্য ও জীবন্ত মাছ ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ, কৃষি পণ্য ১০ শতাংশ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ৫ শতাংশ।
এর বাইরে পাটসহ কিছু পণ্যে রপ্তানি কিছুটা বেড়েছে। এ তালিকায় রয়েছে পাট ও পাটজাত পণ্য ১ দশমিক ৮৪ শতাংশ, প্লাস্টিক পণ্য ১৮ শতাংশ, হস্তশিল্প ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, সমুদ্রগামী জাহাজ ১৮ শতাংশ।