রসনাবিলাসী বাঙালির রান্নার অন্যতম প্রধান উপকরণ পেঁয়াজ নিয়ে আবারও হা-হুতাশ শুরু হয়েছে। কারণ পেঁয়াজের দাম। পেঁয়াজের দাম আকস্মিকই বেড়ে প্রায় সেঞ্চুরি ছুঁয়েছে। এতে করে শুধু বাঙালি নয়, এশিয়াজুড়ে সব দেশে রান্নাঘরে আপাতত নিরামিষী হাবভাব। কারণ রান্নাঘর থেকে গায়েব আমিষ রান্নার মূল উপকরণ পেঁয়াজের। ভারত রপ্তানি বন্ধ করায় এশিয়ার সমস্ত দেশে পেঁয়াজের দামে পড়েছে বিপুল প্রভাব। চড়চড়িয়ে বেড়েছে দাম। বিশেষ করে প্রভাব পড়েছে আমাদের দেশে। ভারত থেকে আসা পেঁয়াজের অভাব পূরণ করতে আর পেঁয়াজের দাম মধ্যবিত্তের নাগালে রাখতে মিয়ানমার, মিশর, তুরস্ক, চীনের মুখাপেক্ষী হয়েছে।
বাংলাদেশের পেঁয়াজের মূল যোগানদাতা ভারত নিজেদের দেশে সংকটের কারণে আপাতত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। আর ভারতের এই পেঁয়াজ সংকটের জন্য দায়ী মহারাষ্ট্র ও কর্নাটকের খরা। ভারতের পেঁয়াজ উত্পাদনের প্রধান দুই কেন্দ্রে খরার জন্যই মজুতের পরিমাণ কমেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারত রপ্তানি বন্ধের পর অনেকেই হুজুগে বাড়তি পেঁয়াজ কিনেছিলেন। এতে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। ফলে দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে। তবে মিয়ানমার, মিশর ও তুরস্ক থেকে কম দামে পেঁয়াজ আমদানির খবর আসছে। এতে দাম কমতে শুরু করেছে। এদিকে পেঁয়াজ সংকট কমাতে পেঁয়াজ আমদানিতে সম্প্রতি ব্যাংকঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক প্রজ্ঞাপনে জানায়, এই সুদহার আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। যদিও ব্যবসায়ীরা বলেছেন, এর প্রভাব বাজারে তেমন একটা পড়বে বলে মনে হয় না।
পেঁয়াজ জিনিসটা একটা আজব চিড়িয়া। পেঁয়াজ একদিকে মসলা, অন্যদিকে সবজি। কাঁচাও খাওয়া যায়, আবার রান্না করেও খাওয়া যায়। ভাজি-ভর্তা-ঝোল সবখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। সব দলের কাছে ব্যবসায়ীরা যেমন বিশেষ মর্যাদা পায়, ঠিক তেমনি ধনী-গরিব সবার কাছেই পেঁয়াজ বিশেষ মর্যাদা পায়। পেঁয়াজের চেহারা সাইজ-স্বাদ সব কিছুই আলাদা রকম। এর কাণ্ড,পাতা-ফুল-ফল সবটাই প্রায় প্রকাশিত। এর শিকড় পর্যন্ত দেখা যায়। ঠিক বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের মতো, যতটা না জ্ঞানের গভীরতা, তার চেয়ে বকবকানি অনেক বেশি। সব বাঙালির যেমন মোটামুটি একই রকম চেহারা-চরিত্র, সব দেশি পেঁয়াজেরই ঠিক একই রকম কোয়া এবং ঝাঁজ!
সব ঋতুতেই পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। তবে রমজান মাসে এবং ঈদুল আযহার সময় এর চাহিদাটা একটু বেশি হয়। রমজানে পেঁয়াজু এবং ঈদুল আযহায় গরুর মাংসের সঙ্গে পেঁয়াজ বেশি লাগে বলে এই দুই সময়ে এর চাহিদা বাড়ে। তবে কাশফুল ফোটা শরতেও পেঁয়াজ সংকট এই জিনিসটাকে আনপ্রেডিকটেবল বানিয়েছে।
আমাদের দেশে নানা বিষয় নিয়ে গবেষণা হলেও গুরুত্বপূর্ণ খাবার-উপাদান পেঁয়াজ নিয়ে তেমন কোনো গবেষণাকর্ম নেই। বাঙালি সমাজে কবে প্রথম পেঁয়াজ খাওয়া শুরু হয় এ ব্যাপারেও বিস্তারিত কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। ভাসা ভাসা যতটুকু তথ্য পাওয়া যায়, তাতে দেখা যায়, বৈষ্ণব ও ব্রাহ্মণরা সাধারণত পেঁয়াজ খেত না। এ ব্যাপারে একটি বিখ্যাত গল্পের কথা নানা ফরমে আমরা সবাই শুনেছি। তবে প্রাচীন গল্পটি গোপাল ভাঁড়ের জবানিতে প্রচলিত রয়েছে। গোপাল একদিন নন্দীগ্রামে যাবে শুনে গোপালের প্রতিবেশী এক গোঁড়া বৈষ্ণব এসে গোপালকে বলল,‘নন্দীগ্রামের পরম বৈষ্ণব ত্রিলোচনের ছেলে বটুকের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। তুমি যখন নন্দীগ্রামে যাচ্ছ তখন আমার জামাইয়ের একটু খোঁজ নিও।
নিন্দুকেরা নানা কথা বলে কিন্তু আমার জামাইকে তোমার খুবই ভালো লাগবে। গোঁড়া বৈষ্ণব বংশের ছেলে। ভালো না হয়ে যায় কোথায়? অনেক বেছে বেছেই তো মেয়েকে ওখানে বিয়ে দিয়েছি।’ দিন সাতেক পরে গোপাল যখন নন্দীগ্রামে থেকে ফিরে এলো, সেই বুড়ো বৈষ্ণব ভদ্রলোক তখন গোপালের কাছে জামাইয়ের খোঁজ নিতে এলো।
ওহে গোপাল, আমার জামাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে?
দেখা হয়েছে বৈকি, আমি তো দিন সাতেক বলতে গেলে আপনার জামাইয়ের ওখানে ছিলাম।
তাই নাকি? তবে তো ভালোভাবেই পরিচয় হয়েছে। আমার জামাইকে তোমার কেমন লাগল গোপাল?
আপনার জামাইটি খুবই ভালো, তবে...
তবে কি গোপাল?
গোঁড়া বৈষ্ণব ওরা। একটু পেঁয়াজ খায় আর কি।
বলো কি গোপাল, পেঁয়াজ খায়? ওর বাবা গোঁড়া বৈষ্ণব। বৈষ্ণবের ছেলে হয়ে পেঁয়াজ খায়?
রোজ কি খায় তাই বলে? এই মাঝে মাঝে খায়, যখন একটু মাংস-টাংস খায়।
কি বলছ গোপাল, আমার জামাই মাংস খায়? বৈষ্ণব বংশের ছেলে হয়ে মাংস খায়। এ যে আমি ভাবতেই পারছি না একদম।
এতে ঘাবড়াবার কিছু নেই, রোজ কী আর মাংস খায় নাকি? এই যখন একটু টানে তখনই খায়।
টানে মানে? সে তামাক খায় নাকি?
না তামাক নয়। গুরুজনের সামনে তামাক খাবে কি করে? টানে মানে যখন একটু মদ টানে। তবে আপনার জামাইয়ের বেশ জ্ঞানগম্যি আছে বৈকি। সবার সামনেই কি আর মদ টানে, লুকিয়ে লুকিয়ে টেনে আসে।
কি বলছ গোপাল, আমার জামাই মদ খায়?
রোজ কি আর মদ খায় নাকি? এই যেদিন একটু এদিক-ওদিক যায়, সেদিন কেবল খায়।
এদিক-ওদিক যায় মানে?
এই পাড়ায়-টাড়ায় যায়। বুঝলেন না—বেশ্যাপাড়ায় মেয়েছেলেরা তো মোটেই ভালো নয়। ওদের পাল্লায় পড়ে মাঝেমাঝে মদ টানতে হয়।
গোপালের কথা শুনে বৈষ্ণব ভদ্রলোক আর স্থির থাকতে পারলেন না, অস্থিরচিত্তে বাড়ি ফিরে গেলেন। তারপর আর গোপালের কাছে কখনো জামাইয়ের খোঁজ নিতে আসেননি। নিজেও জামাইবাড়িতে আর বেড়াতে যাননি।
যাহোক, পেঁয়াজ খেলে মানুষের ‘তেজ’ বাড়ে এমন একটা ধারণা সমাজে প্রচলিত আছে। তাই তো হিন্দু বিধবা কিংবা সন্ন্যাসীরা নিরামিষ খায়। নিরামিষে পেঁয়াজ নিষিদ্ধ। পেঁয়াজকে আমিষ হিসেবে গণ্য করা হয়। ভারতবর্ষে মুসলিম শাসন বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে পেঁয়াজের বিকাশ ঘটেছে বলে অনেক পেঁয়াজবিদ মনে করেন। ব্যাপারটিকে অযৌক্তিক বলা যাবে না। মাংসপ্রিয় মুসলিম শাসকদের হাত ধরে এই বাংলা মুলুক এমন পেঁয়াজময় হওয়াটা মোটেও অবিশ্বাস্য নয়। এখন দুঃখ-দারিদ্র্য-অভাব-অনটন-কলহের মতো বাঙালির জীবনে পেঁয়াজ অনিবার্য হয়ে উঠছে। পেঁয়াজ ছাড়া রান্নাঘর চিন্তা করা যায় না। পেঁয়াজ খাওয়া এখন বাঙালির অভ্যাস হয়ে গেছে। যে পদে না দিলেও চলে, সেখানেও পেঁয়াজ দেওয়া হয়, আর যেখানে পেঁয়াজের দাবি আছে, সেখানে তো দেওয়া হবেই। অভ্যাসবশেই এখন রান্নায় কম-বেশি পেঁয়াজ দেওয়া হয়। এ কারণে পেঁয়াজের চাহিদা দিন দিন বেড়ে চলেছে। পেঁয়াজের প্রতি এই আকর্ষণ যদি অব্যাহত থাকে, আর দাম যদি না কমে, তা হলে পেঁয়াজ কিনতে কিনতেই গোটা জাতি ফতুর হয়ে যাবে।
প্রচলিত গল্পে যতই পেঁয়াজের ‘দোষের’ কথা বলা হোক না কেন, আসলে কিন্তু পেঁয়াজের অনেক গুণ রয়েছে। ঠাণ্ডা লেগে মাথাব্যথা হলে এক চামচ পেঁয়াজের রসের সঙ্গে দ্বিগুণ পানি মিশিয়ে একবার খেলে ব্যথা কমে যাবে। জ্বর জ্বর ভাব হলে পেঁয়াজের রস নাক দিয়ে টেনে নিলে জ্বর জ্বর ভাব চলে যাবে। বার বার বমি হলে চার-পাঁচ ফোঁটা পেঁয়াজের রস পানিতে মিশিয়ে সেই পানি খেলে বমি হওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। হেঁচকি উঠলে পেঁয়াজের রস মেশানো পানি খেলে হেঁচকি ওঠা বন্ধ হয়ে যাবে। পেঁয়াজ খেলে শরীরের অতিরিক্ত ইউরিক এসিড বের হয়ে যায়। পেঁয়াজের অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল বা ব্যাকটেরিয়া নামক গুণাগুণ রয়েছে। তাই ফোড়া বা ঘা হলে তা পেঁয়াজের রস দিয়ে ধুলে তাড়াতাড়ি সেরে যায়। চুল ধোবার আগে মাথায় আধঘন্টা পেঁয়াজের রস মেখে রাখলে চুলের গোড়া শক্ত হয় এবং নতুন চুল গজাতে সহায়তা করে। বাত-ব্যথার রোগীরা নিয়মিত পেঁয়াজ খেলে ব্যথা কম থাকে। এমনি পেঁয়াজের আরো নানা গুণের কথা শোনা যায়। এত যার গুণ সেই পেঁয়াজের দাম বাড়বে, সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে—এ আর বিচিত্র কী!
পরিশেষে পেঁয়াজ নিয়ে একটি পুরোনো গল্প।
গ্রামে একটা চোর ধরা পড়ল। গ্রামের সকল গণ্যমান্য ব্যক্তিকে ডাকা হলো চোরের বিচার করার জন্য। সালিশিতে ঠিক হলো, হয় চোরকে দশটা জুতার বাড়ি খেতে হবে না হলে দশটা পেঁয়াজ খেতে হবে। তখন চোরটা বলল, জনাব, জুতা মারলে আমাকে লাগবে, আপনারা আমাকে পেঁয়াজ দেন, আমি দশটা পেঁয়াজই খাব। তখন চোরটিকে দশটা পেঁয়াজ দেয়া হলো। চোরটা সেখান থেকে একটা পেঁয়াজ নিয়ে অর্ধেক খেয়ে বলল, কী ঝাঁজরে বাবা! আগে যদি জানতাম পেঁয়াজে এত ঝাঁজ তাহলে জুতার বাড়ি বেছে নিতাম। জনাব, আমাকে জুতার বাড়ি দেন, আমি পেঁয়াজ খাব না।
তারপর চোরটিকে জুতার বাড়ি দেওয়া শুরু হলো!
কিন্তু একটা জুতার বাড়ি খেয়েই চোরটা বলল, না না জুতার বাড়িতে অনেক ব্যথা, আমি পেঁয়াজই খাব। আমাকে পেঁয়াজ দেন। তখন চোরটিকে আবারও পেঁয়াজ দেওয়া হলো! পেঁয়াজ খেয়ে চোরটা বলল, না না আমাকে জুতার বাড়িই দেন, আমি পেঁয়াজ খাব না! এরকম করতে করতে চোরটা দশটা জুতার বাড়িও খেল আবার দশটা পেঁয়াজও শেষ করে ফেলল!
আমাদের বাঙালিরও হয়েছে একই দশা!
n লেখক :রম্যরচয়িতা