সনাতনধর্মে সাকার ও নিরাকার দুই প্রকার উপাসনা রয়েছে। সাকার উপাসনায় প্রতিমা পূজা করা হয়। কারণ ‘সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম’(ছান্দোগ্য উপনিষদ, ৩/১৪/১) অর্থাত্ সব কিছুতেই ব্রহ্ম বিদ্যমান। বেদে ঈশ্বর বলেছেন- আমি এক আছি, বহু হব। এ বহু হওয়ার বাসনাতেই ঈক্ষণ শক্তির দ্বারা সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি বহু হয়েছেন- নিজ আনন্দ উপভোগের ইচ্ছায়। দেব-দেবীগণ একই ব্রহ্ম বা ঈশ্বরের ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশমাত্র। বিশ্ববরেণ্য দার্শনিক ড. মহানামব্রত ব্রহ্মচারীজী বলেছেন, ‘ঈশ্বরের সহিত সম্বন্ধ পাতাইবার যত প্রকার উপায় মানুষ আবিষ্কার করিয়াছে, তন্মধ্যে পূজাই সর্বশ্রেষ্ঠ।’ শ্রীশ্রী চণ্ডীতে (১০/৫) দেবী বলেছেন- আমি তো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে একাই, আমার কেউ দ্বিতীয় নাই (আমি অদ্বিতীয়া পরাশক্তি ব্রহ্মরূপিণী)। চৈতন্যরূপে সর্বত্র বিরাজিতা। এ জগতে আমি ছাড়া সবই শব। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন- তোমরা যাকে ব্রহ্ম বল, আমি তাকে মা বলি।
দেবী দুর্গার প্রতিমাতে মায়ের সঙ্গে আছে সুর বা দেবশক্তি-লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ; চালচিত্রে আছেন- মঙ্গলকারী শিব; পদতলে আছে- আসুরিক শক্তি মহিষাসুর। দেবী দুর্গার সঙ্গে বর্ণিত সবার পূজা করা হয়। সমাজে আমরা চার শ্রেণির- ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র লোকজনের বসবাস; কারো গুরুত্ব কম নয়! মায়ের পূজাতে কামার, কুমার, ধোপা, নাপিত, পুরোহিত সকল বর্ণের মানুষ সম্পৃক্ত থাকেন। শ্রীশ্রী দুর্গামায়ের কাঠামোতেও সে চার শ্রেণির সমাবেশ। বিদ্যাদেবী সরস্বতী- ব্রাহ্মণ, দেবসেনাপতি কার্তিক- ক্ষত্রিয়, ধনদেবী লক্ষ্মী- বৈশ্য এবং গণপতি গণেশ হলেন- শূদ্র। এই চারশক্তি সঙ্গে থাকলে সুশৃঙ্খল ও প্রগতিশীল সমাজ গঠন সম্ভব। যদিও পৃথক পৃথকভাবে তাদের পূজা করা হয়। আবার বাহন- সিংহ, হাঁস, ময়ূর, পেঁচা, ইঁদুর, ষাঁড় ছোটো-বড়ো প্রভৃতি প্রাণী দেবীর সঙ্গে শোভিত হচ্ছে। কেন? কারণ প্রকৃতির সুরক্ষায় সে সব প্রাণীর ভূমিকা যেমনি অপরিসীম তেমনি সিংহ-ষাঁড়কে, ময়ূর-সাপকে, কিংবা পেঁচা-ইঁদুরকে দেখেও তেড়ে না এসে, হিংসা-বিবাদ ভুলে গিয়ে মায়ের আদর-শাসনে একত্রে রয়েছে; তারা আমাদেরও একত্রে থাকার শিক্ষা দিচ্ছে।
দেবীর বাহন সিংহ। আকৃতিতে বড়ো, সব পশুর শক্তির প্রতীক পশুরাজ সিংহ। সুশ্রী ময়ূর কামরহিত। সমাজে অসুর স্বভাবের মানুষকে কাম থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেয়। কুশ্রী পেঁচা দিবান্ধ। যারা ঈশ্বরকে ভুলে লোভ-লালসায় মত্ত হয়ে অসত্ পথে অর্থোপার্জন করে তারাও সমাজের কুশ্রী। পেঁচা তাদের অসত্ পথ থেকে বিরত থাকতে বলে। গণেশ সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী বৃহত্ জীব হাতির মাথাকে শিরোভূষণ করেছেন এবং অতিশয় ক্ষুদ্র ও উপেক্ষিত ইঁদুরকে বাহন হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাতে দেখিয়েছেন বৃহতের সঙ্গে ক্ষুদ্রের সমাবেশ। কারণ সমাজে কেউ অবহেলার পাত্র নয়। সাধারণ জনতার শক্তিই বড়ো শক্তি। বলছে- সমাজে উঁচু-নিচু, ধনী-দরিদ্র সকলেরই প্রয়োজন রয়েছে। হাঁস-অসারকে ফেলে সার গ্রহণ করে। দুধ ও জল মিশ্রণ করে দিলে হাঁস জল ফেলে শুধু দুধটুকু গ্রহণ করে নেয়। কিংবা কাদায় মিশ্রিত স্থান থেকেও তার খাদ্য খুঁজে নিতে পারে। মায়ের সঙ্গে থেকে সেও শিক্ষা দিচ্ছে- আমরাও যেন সকল অসার বা ভেজাল পরিহার করে সার বা ভালো কিছু নিয়ে সুন্দর পথে চলতে পারি।
মা দুর্গা- স্বামী, সন্তান নিয়ে মর্তে পাঁচ দিন পূজিত হচ্ছেন, বিজয়ানন্দে মা কৈলাশে ফিরেও যাচ্ছেন। কিন্তু ভক্তরা সর্বদা মাকে হূদয়ঘটে স্থাপন করে রাখেন। ‘অল্পে সুখ নেই, সর্বব্যাপক সত্তাতেই সুখ (ছান্দোগ্য উপনিষদ, ৭/২৩/১)।’ নিজের স্বার্থতা বা ক্ষুদ্রতায় কোনো স্বস্তি ও কল্যাণ নেই। তাই সনাতনীগণ সকলের মনের অহমিকা ও জৌলুসের প্রতিযোগিতাকে ভুলে- সৃষ্ট সকল প্রাণীর মঙ্গল ও শান্তির জন্য দেবীর নিকট প্রার্থনা জানায়। সকলে যেন এক সঙ্গে চলি। এক চিন্তাধারায় স্নাত হয়ে সকলে এক সঙ্গে বলি। সকলে জানি সকলের মনকে। ভালোবাসি সবাইকে।
n লেখক : সাংগঠনিক সম্পাদক-কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী
পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু সমাজ সংস্কার সমিতি