কর্ণফুলীর তলদেশে বিপুল প্লাস্টিকের আস্তরণ

প্লাস্টিক একটি মহা আবিষ্কার। ভালো এবং খারাপ—উভয় অর্থেই। প্লাস্টিকের সবচাইতে গুরুতর ‘গুণাবলি’ হইল, ইহা অপচ্য। হয়তো সামান্য মূল্য দিয়া একটি পলিথিনের ব্যাগ কিংবা চিপস, পানির বোতল ক্রয় করা সম্ভব। কিন্তু ঐ ব্যাগ, খালি প্যাকেট, খালি বোতলের সুদূরপ্রসারী ক্ষতির দিক বিবেচনা করিলে উহার প্রকৃত মূল্য অনেক অনেক বেশি। সম্প্রতি পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদ হইতে জানা গিয়াছে, প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে মুখ থুবড়াইয়া পড়িয়াছে কর্ণফুলী নদীর বহুল প্রত্যাশিত ক্যাপিটাল ড্রেজিং। নদীর তলদেশে দুই হইতে সাত মিটার অবধি পলিথিনের স্তর জমিয়া যাওয়ায় অত্যাধুনিক ড্রেজার মেশিনও কাজ করিতে পারিতেছে না। বন্দরসংশ্লিষ্টরা বলিতেছেন, পুরোদমে কাজ করিতে পারিলে ইতিমধ্যে প্রকল্পের সিংহভাগ শেষ হইয়া যাইত। কিন্তু পলিথিন জটিলতায় কাজ আটকাইয়া যাইবার ফলে এতদিনে শেষ হইয়াছে মাত্র ২২-২৩ শতাংশ কাজ। এই জটিলতা দেখা দিয়াছে মূলত গত বত্সর হইতে। জানা গিয়াছে, বিভিন্ন খাল হইয়া পলিথিন ও অন্যান্য কঠিন বর্জ্য নদীর তলদেশে জমিয়া গিয়াছে। এমন পরিস্থিতিতে গত বত্সরের ডিসেম্বরে চীন হইতে আনা হয় অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ৩১ ইঞ্চি ব্যাসের একটি সাকশন ড্রেজার। আশা করা হইয়াছিল এই ড্রেজার যুক্ত হইলে গতি আসিবে খননকাজে। কিন্তু বিধিবাম। ছোটো আকারের ড্রেজারের মতো ইহাও পলিথিনের স্তর খনন করিতে ব্যর্থ হইতেছে।

প্লাস্টিকের উপাদান বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে ফেলিয়াছে সেই ব্যাপারে এখন আর কাহারো কোনো দ্বিমত নাই। গত বত্সর ইন্দোনেশিয়ার সমুদ্র উপকূলে প্রায় ১০ মিটার লম্বা একটি তিমি ধরা পড়িয়াছিল, যাহার পেটের মধ্যে পাওয়া গিয়াছিল হাজারখানেক প্লাস্টিক পণ্য। কয়েক মাস পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোয় প্লাস্টিক বৃষ্টির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করিয়াছেন পরিবেশবিজ্ঞানীরা। দক্ষিণ ফ্রান্সের পিরেনিজ এলাকাতেও বৃষ্টির পানিতে মিলিয়াছে প্লাস্টিকের কণা। প্ল­াস্টিক কতখানি অপচ্য, তাহা আমরা কমবেশি সকলেই জানি। ইহার আয়ুষ্কাল কমপক্ষে ৫০০ বত্সর। কেবল তিমি নহে, প্ল­াস্টিকের ছোটো ছোটো অংশ প্রতিদিন আমাদের পেটেও ঢুকিতেছে। অথচ তাহা আমরা জানিতেও পারিতেছি না। সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গিয়াছে পৃথিবীর সব ধরনের জলাশয়ে এত বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য মিশিয়াছে যে, তাহার টুকরো টুকরো কণা প্রতিনিয়তই গিলিতেছে সকল প্রজাতির মাছ। আর এই সকল মাছ খাইয়া পরোক্ষভাবে আমরাও প্লাস্টিক খাইয়া ফেলিতেছি। মনে রাখিতে হইবে, পৃথিবীর অস্তিত্ব টিকিয়া আছে সামুদ্রিক সিস্টেমের কারণে। খাদ্য ও অক্সিজেন সরবরাহের মাধ্যমে সমুদ্রগুলি পৃথিবীর প্রাণিকুলের অস্তিত্ব রক্ষা করে।

আশার কথা হইল, বিশ্ব জুড়িয়াই প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হইতেছে। বাংলাদেশের মানুষ মাথাপিছু গড়ে প্রায় চার কেজি প্লাস্টিক ব্যবহার করিয়া থাকে। বিশ্বের তুলনায় এই ব্যবহার কম হইলেও ক্ষতি কিন্তু কম হইতেছে না। বাংলাদেশে ২০০২ সালে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করা হইয়াছিল। কিন্তু পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার দিনকে দিন বাড়িয়াই চলিতেছে। সুতরাং সময় থাকিতে সচেতন না হইলে ইহার সুদূরপ্রসারী ক্ষতি হইতে আমাদের কেহ রক্ষা করিতে পারিবে না।