চলতি (২০১৯-২০) অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের মোট দেশজ উত্পাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২ শতাংশ হওয়ার পূর্বাভাস দিলো বিশ্বব্যাংক। সরকারি বাজেটে প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হলেও সংস্থাটি বলছে, রপ্তানি, রেমিট্যান্স এবং অভ্যন্তরীণ ভোগ ব্যয়ের ওপর ভর করে ৭ শতাংশের ওপরেই থাকবে প্রবৃদ্ধি। সরকারি হিসাবের চেয়ে কমিয়ে পূর্বাভাস দিলেও ৭ শতাংশের ওপরে প্রবৃদ্ধি অর্জন শক্তিশালী অর্থনীতিকে নির্দেশ করে বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক।
গতকাল আগারগাঁওয়ে বিশ্বব্যাংকের কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট, অক্টোবর-২০১৯’ শীর্ষক হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এ উপলক্ষ্যে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি মিয়ং টিমবন। মূল প্রতিবেদন তুলে ধরেন বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ বার্নার্ড হ্যাভেন। আরো বক্তব্য দেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।
এবারের প্রতিবেদনে বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। সেইসঙ্গে দেশের আর্থিক খাত নিয়েও সতর্ক করা হয়েছে। বিশেষ করে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আর্থিক খাতে সুশাসনের অভাব এবং দুর্বল রাজস্ব আদায় অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি হিসেবে দেখছে বিশ্বব্যাংক।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে সরকারের লক্ষ্য ও বিশ্বব্যাংকের পূর্বভাসে ফারাকের বিষয়ে জানতে চাইলে কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি মিয়ং টিমবন বলেন, সংখ্যা মূল বিষয় নয়। প্রবৃদ্ধির সুফল কতটা মিলছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি মৌল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ভালো করেছে এবং ভবিষ্যতে আরো ভালো করবে। এখন প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। আর্থিক কাঠামোতে সংস্কার হলে আগামী দুই-তিন বছরে বাংলাদেশের অবস্থা আরো পাল্টে যাবে।
তিনি বলেন, এই প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বাংলাদেশের একটি উচ্চ উত্পাদনশীল অর্থনীতি প্রয়োজন। উচ্চ স্তরের দক্ষতা এবং দ্রুত প্রযুক্তিগত অগ্রগতির জন্য শ্রমবাজারের চাহিদার জন্য মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে। ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে হবে। কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষাব্যবস্থা খুবই জরুরি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে দক্ষ জনশক্তির বিকল্প নেই।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রেকর্ড ১৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। রপ্তানি আয়ও বেড়েছে। বিশেষ করে চীনা পণ্যে মার্কিন শুল্ক আরোপের পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের চাহিদা বেড়েছে। দেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৪৩ শতাংশ। বেসরকারি ভোগ ব্যয় বেড়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে ব্যাংকগুলোতে খেলপি ঋণ বেড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবছর শ্রমবাজারে যুক্ত হওয়া ২০ লাখ মানুষকে উন্নত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য মানবসম্পদ উন্নয়নে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে হবে। বিশেষ করে কারিগরি এবং তথ্য প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা সম্পন্ন শ্রমশক্তি তৈরি করতে হবে।
প্রতিবেদনে শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিয়ে একটি বিশ্লেষণ দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, উচ্চ শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানে বড় ফারাক লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের মাত্র ১৯ শতাংশ পূর্ণকালীন অথবা খণ্ডকালীন কর্মে নিয়োজিত রয়েছে। শিক্ষার টারশিয়ারি বা তৃতীয় স্তর সম্পন্ন করা (কলেজ) এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী এক থেকে দুই বছর বেকার থাকছে। উচ্চ শিক্ষা সম্পন্ন করা তরুণদের চেয়ে তরুণীরাই বেশি বেকার। উচ্চ শিক্ষিতদের নিয়ে করা জরিপের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, উচ্চ শিক্ষা সম্পন্ন করা ৪৪ শতাংশ ছেলে এবং ২৫ শতাংশ মেয়ে কর্মে নিয়োজিত পাওয়া গেছে। যারা করিগরি শিক্ষা নিয়েছে তাদের ৪৯ শতাংশ কর্মে নিয়োজিত রয়েছে। অর্থাত্ সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতদের তুলনায় কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিতদের মাঝে বেকারত্বের হার কম।
কলেজ পাশ করা শিক্ষার্থীরা কর্মে প্রবেশ করে মাসে আয় করছে গড়ে মাত্র ১১ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে ২৫ থেকে ৩৫ বছর বসয়ীদের জাতীয় গড় আয় ১২ হাজার ৮০০ টাকা। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পার করে কর্মে প্রবেশ করে একজন গড়ে আয় করছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা।
বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ বার্নার্ড হ্যাভেন বলেন, শ্রমশক্তি জরিপের তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের নিয়োগকর্তারা কারিগরি এবং ব্যবস্থাপক পদে নিয়োগের জন্য হিমশিম খাচ্ছেন। একদিকে বেকারত্ব অন্যদিকে দক্ষ জনশক্তির অভাব। অর্থাত্ শ্রমবাজারে চাহিদা ও যোগানের মধ্যে ফারাক থেকে যাচ্ছে। এজন্য দক্ষতা বাড়াতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে হবে। নারী ও দরিদ্র মানুষের সুযোগ বাড়াতে হবে।
অর্থনীতি বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন খাতে সরকারের ভতুর্কি বেড়ে যাওয়া এবং লক্ষ্য অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হওয়ার ফলে বাজেট ঘাটতি বাড়তে পারে। সম্প্রতি ভর্তুকি বাড়ানো হয়েছে। বাজেটে বিশেষ করে রেমিট্যান্সে ২ শতাংশ প্রণোদনা, তৈরি পোশাক খাতে বাড়তি ১ শতাংশ নগদ ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু রাজস্ব খাতে সংস্কার কার্যক্রম শেষ হয়নি। টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য চলমান সংস্কার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে হবে। রফতানি বহুমুখীকরণ, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় বিশেষ নজর দিতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমানে বিশ্ববাজারে দুর্বলতা বিরাজ করছে। বিক্রয়মূল্য কমে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে। চীনা পণ্যে শুল্ক বসানো হয়েছে। ফলে ক্রেতারা এখন সস্তায় বাজার খুঁজছে। অন্যদিকে মূল্য প্রতিযোগিতায় আমাদের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ভিয়েতনাম ও ভারতের সঙ্গে পেরে ওঠা যাচ্ছে না। এসব মোকাবিলা করা অন্যতম চ্যালঞ্জ।