খুনিদের ফাঁসির দাবিতে উত্তাল বুয়েট

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ক্যাম্পাসে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই কানে ভেসে আসে ‘খুনিদের ফাঁসি চাই’ স্লোগান। বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনারের সামনে একত্রিত হয়ে এই স্লোগান দিচ্ছিলেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। গতকাল বৃহস্পতিবার বুয়েট ক্যাম্পাসের চিত্র ছিল এমন। তড়িত্ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনার চার দিন পরও অব্যাহত রয়েছে আন্দোলন। সকাল থেকেই বুয়েটের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে জড়ো হতে থাকেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। আগের দিনের মতো বকশীবাজার থেকে পলাশীর রাস্তা বন্ধ করে বিক্ষোভ করেন আন্দোলনকারীরা।  

১০ দফা আদায়ে দিনভর বিক্ষোভ শেষে বিকাল ৪টার দিকে আন্দোলন স্থগিত করেন শিক্ষার্থীরা।   আজ শুক্রবার ফের আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন তারা। উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলামকে আজ দুপুরের মধ্যে শিক্ষার্থীদের কাছে উপস্থিত হয়ে জবাবদিহি করার আহ্বান জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। বেলা ২টার মধ্যে দেখা না করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।

এদিকে দুপুর থেকে দুই ঘণ্টা ধরে উপাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাকে মোবাইলে পাননি বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তারা জানান, উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহযোগীর (পিএস) সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা জানতে পেরেছেন, উপাচার্য কাউন্সিল অফিসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করতে রাজি আছেন, তবে কোনো গণমাধ্যমকর্মীর প্রবেশাধিকার থাকবে না সেখানে; কিন্তু খোলা জায়গায় গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনা করার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

‘সংগঠনভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ চাই’ 

আন্দোলনের এক পর্যায়ে বুয়েটের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শীর্ষ সংশপ্তক বলেন, ‘আমাদের আন্দোলন ছাত্ররাজনীতির বিরুদ্ধে নয়। আমরাও স্বীকার করি যে আমাদের দেশের ইতিহাসে ছাত্ররাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল; কিন্তু আজকে বুয়েটে যে নষ্ট ছাত্ররাজনীতি হচ্ছে, যার জন্য আমরা আসলে বেঁচে থাকতে পারছি না, যার জন্য হলে ও ক্যাম্পাসে প্রতিটি শিক্ষার্থী ত্রাসের মধ্যে থাকে, আমাদের আন্দোলন তার বিরুদ্ধে। প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই, কারণ তিনি এ বিষয়টির স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলে এটি বন্ধ করে দিতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কোনো প্রভাব থাকবে না।’

শীর্ষ আরো বলেন, ‘আমাদের আন্দোলনটি আসলে রাজনীতির বিরুদ্ধে নয়, শুধু বুয়েট ক্যাম্পাসে সংগঠনভিত্তিক ছাত্ররাজনীতির বিরুদ্ধে। এজন্য প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সত্ সাহস ও সদিচ্ছা। আশা করব, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর আমাদের প্রশাসন ও উপাচার্য এ বিষয়ে পিছিয়ে থাকবেন না। উপাচার্য স্যার আসবেন, আমাদের সব প্রশ্নের উত্তর দেবেন এবং আমাদের দাবিগুলো মেনে নেবেন।’ উপাচার্যের প্রতি আহ্বান জানিয়ে অপর শিক্ষার্থী অন্তরা বলেন, ‘স্যার, আপনি আসুন, আমরা শুধু কথা বলব। আপনার প্রতি আমাদের কোনো রাগ নেই।’

ভিসির অপসারণ দাবিতে অটল শিক্ষক সমিতি 

অদক্ষতা ও নির্লিপ্ততার অভিযোগে উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে অটল রয়েছে বুয়েট শিক্ষক সমিতি। এর আগে মৌখিকভাবে এ দাবি জানালেও গতকাল লিখিত আকারে এ দাবি জানানো হয়। এছাড়া বুয়েটে শিক্ষকরাজনীতি ও ছাত্ররাজনীতি বন্ধে প্রশাসনের সহায়তা কামনাসহ সাতটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষক সমিতি। তারা বলছে,  উপাচার্য যদি পদত্যাগ না করেন, তাহলে সরকার যেন তাকে অপসারণ করে। বেলা পৌনে ৩টার দিকে বুয়েটের শহিদ মিনারের পাশে শিক্ষক সমিতি ও অন্য শিক্ষকরা এ সাত সিদ্ধান্তের কথা জানান। এর আগে শিক্ষক সমিতির এক জরুরি সভায় এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় বলেও জানানো হয়। সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি এ কে এম মাসুদ। এ সময় ১০ দফা দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা করতালি দিয়ে এই দাবির প্রতি সমর্থন জানান।

ছাত্রলীগের মৌন মিছিল

আবরার হত্যার প্রতিবাদে বেলা ১২টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শোকশোভাযাত্রা বের করে ছাত্রলীগ। শোকশোভাযাত্রা শেষে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে আয়োজিত এই সমাবেশে তিনি আবরার ফাহাদের হত্যার বিচার দাবি করেন। জয় বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। একই সঙ্গে আর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেন এই রকম মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয় সেদিকে নজর রাখতে সংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান।

‘শিক্ষার্থীদের ভয় দেখাতেই এ মিছিল’

ছাত্রলীগের মৌন মিছিলের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) নূরুল হক বলেন, ‘ছাত্রলীগ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ভয় দেখানোর জন্য এই মৌন মিছিলের আয়োজন করেছে।’ তিনি বলেন, ‘যখনই কোনো ঘটনা ঘটে সেই ঘটনাকে অন্যদিকে প্রশমিত করার জন্য নানা লোক দেখানো ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিভিন্ন আশ্বাস দেওয়া হয়। আবরার হত্যারও বিচার যেন সেদিকে ধাবিত না হয় তার জন্য আমরা আন্দোলন-সংগ্রাম করছি।’

ভিপি আরো বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিয়েছে—মাস্টার্স শেষ হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে হল ছাড়তে হবে। এটি একটি ভালো সিদ্ধান্ত; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এতদিন কেন এটা করেনি? আজকে যখন ছাত্রসমাজ আবরারের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেছে তখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের টনক নড়েছে। আসলে ছাত্রসমাজ যখন রাজপথে থাকে তখনই প্রশাসনের টনক নড়ে। তাই সব অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখতে হবে।’