নবম-দশম শ্রেণির জীববিজ্ঞান পড়াশোনা

মো. আসাদ-উজ্জামান, শিক্ষক

সরকারি মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা

 

প্রস্বেদন (Transpiration) : স্থলজ উদ্ভিদ যে শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় তার বায়বীয় অঙ্গের মাধ্যমে বাষ্পাকারে পানি বের করে দেয় তাকে প্রস্বেদন বলে। উদ্ভিদের পাতা ও অন্যান্য বায়বীয় অঙ্গ থেকে জলীয় বাষ্প বের হয়ে যাবার প্রক্রিয়াকে প্রস্বেদন বলে।

প্রস্বেদন উদ্ভিদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। এর ফলে উদ্ভিদ দেহ থেকে প্রচুর পানি বাষ্পাকারে বেরিয়ে যায়। এতে কোনো কোনো সময় উদ্ভিদের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাই আপাত দৃষ্টিতে প্রস্বেদন উদ্ভিদের জন্য ক্ষতিকর প্রক্রিয়া বলেই মনে হয়। এজন্য প্রস্বেদন কে Necessary  evil বলা হয়।

প্রস্বেদন সংঘটনের স্থানের ভিত্তিতে প্রস্বেদন তিন প্রকার। যথা-

 পত্ররন্ধ্রীয় প্রস্বেদন (Stomatal transpiration)

 ত্বকীয়/ কিউটিকুলার প্রস্বেদন (Cuticular transpiration)

 লেন্টিকুলার প্রস্বেদন (Lenticular transpiration)

পত্ররন্ধ্রীয় প্রস্বেদন : পাতায়, কচি কাণ্ডে, ফুলের বৃতি ও পাপড়িতে দুটি রক্ষিকোষ বিশিষ্ট এক প্রকার রন্ধ্র থাকে। এদের পত্ররন্ধ্র বলে। পত্ররন্ধ্রের মাধ্যমে যে প্রস্বেদন হয় তাকে বলা হয় পত্ররন্ধ্রীয় প্রস্বেদন। উদ্ভিদের ৯০- ৯৫% প্রস্বেদন হয় পত্ররন্ধ্রের মাধ্যমে।

কিউটিকুলার প্রস্বেদন : উদ্ভিদের বহি:ত্বকে বিশেষ করে পাতার উপরে ও নিচে কিউটিনের আবরণ থাকে। এ আবরণকে কিউটিকল বলে। কিউটিকল ভেদ করে কিছু পানি বাষ্পাকারে বাহির হয়। এই প্রক্রিয়াকে কিউটিকুলার প্রস্বেদন বলে।

লেন্টিকুলার প্রস্বেদন : উদ্ভিদের কাণ্ডের বাকল ফেঁটে লেন্টিসেল নামক ছিদ্রের সৃষ্টি হয়। লেন্টিসেলের মাধ্যমে কিছু পানি বাইরে বের হয়ে যাবার প্রক্রিয়াকে লেন্টিকুলার প্রস্বেদন বলে।

প্রস্বেদনের প্রভাবক : প্রস্বেদনের ফলে অতিরিক্ত পানি উদ্ভিদ দেহ থেকে বের হয়ে যায় এবং এর ফলে সৃষ্ট টানে পানি শোষিত হয়। এ প্রক্রিয়াটি অনেকগুলো প্রভাবকের উপর নির্ভরশীল। প্রস্বেদনের প্রভাবক কে দুভাগে ভাগ করা যায়, যথা-

১। বাহ্যিক প্রভাবক         ২। অভ্যন্তরীণ প্রভাবক

বাহ্যিক প্রভাবক : উদ্ভিদ দেহের বাইরে অবস্থান করে যারা প্রস্বেদনকে প্রভাবিত করে তাদেরকে বাহ্যিক প্রভাবক বলে, যথা-

তাপমাত্রা (Temperature) : তাপমাত্রার তারতম্যের সঙ্গে প্রস্বেদনের হারও ওঠানামা করে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে বায়ুমণ্ডলের জলীয়বাষ্প ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ফলে প্রস্বেদনের হার বেড়ে যায়। তাপমাত্রা কমে গেলে প্রস্বেদনের হার কমে যায়। 

আপেক্ষিক আর্দ্রতা : বায়ুতে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ ও বায়ুর জলীয়বাষ্প ধারণ ক্ষমতার আনুপাতিক হারকে আপেক্ষিক আর্দ্রতা বলে। আপেক্ষিক আর্দ্রতা কম থাকলে প্রস্বেদনের হার বেড়ে যায় এবং বেশি থাকলে হার কমে যায়।

আলো (Light) : আলোর উপস্থিতিতে পত্ররন্ধ্র খুলে যায়, ফলে প্রস্বেদনের হার বৃদ্ধি পায়। কিন্তু অন্ধকারে পত্ররন্ধ্র বন্ধ থাকায় এই প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।

বায়ুপ্রবাহ (Wind) : বায়ু প্রবাহের তারতম্যের কারণে প্রস্বেদন হারের তারতম্য ঘটে। বায়ুচাপ বৃদ্ধিতে বাষ্পীয়ভবন ক্রিয়া হ্রাস পায়, ফলে প্রস্বেদন কমে যায়। আবার বায়ুচাপ কমে গেলে বাষ্পীয়ভবন প্রক্রিয়া বৃদ্ধি পায় এবং প্রস্বেদনের হারও বেড়ে যায়।

অভ্যন্তরীণ প্রভাবক :

ত্বকরন্ধ্র: ত্বকরন্ধের সংখ্যা, আয়তন, গঠন ও অবস্থানের উপর প্রস্বেদন হারের তারতম্য ঘটে।

পত্রের সংখ্যা: পত্রের সংখ্যা ও অবস্থানের উপর প্রস্বেদন হারে তারতম্য লক্ষ্য করা যায়।

পত্রফলকের আয়তন: পত্রফলকের আয়তন বড় হলে প্রস্বেদনের হার বেড়ে যায়, আয়তন কমে গেলে প্রস্বেদনের হারও কমে যায়।

উদ্ভিদের বায়বীয় অঙ্গের আয়তন: পাতা ও কাণ্ডসহ উদ্ভিদের বায়বীয় অঙ্গের কলেবর বৃদ্ধি পেলে প্রস্বেদনের হার বেড়ে যায়।