ইলিশ মাছ সবার জন্য সহজলভ্য করতে হলে

ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের ইলিশ মাছ ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সাগর ও নদী দুই জায়গায়ই ইলিশের বিচরণক্ষেত্র। ইলিশ পছন্দ করে না, এমন বাঙালি দেশে ও বিদেশে খুঁজে পাওয়া খুব দুষ্কর। মা ইলিশ শিকারের ওপর অবরোধসহ সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের কারণে ইলিশের প্রজনন ও উত্পাদন উল্লে­খযোগ্যভাবে বেড়েছে। মা ইলিশের সংরক্ষণ ও নির্বিঘ্ন প্রজননের জন্য সরকারের মত্স্য ও প্রাণিসমপদ মন্ত্রণালয় চলতি মাসের ৯ অক্টোবর থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশ ধরা, ক্রয়-বিক্রয় ও পরিবহন নিষিদ্ধ করেছে। এ সময় মা-ইলিশেরা ৮০ শতাংশ ডিম পাড়ে। তারা ডিম পাড়ে মূলত মিঠাপানিতে। তাই আশ্বিনের পূর্ণিমার চার দিন আগে এবং পূর্ণিমার পর ১৮ দিন মোট ২২ দিন দেশের উপকূলীয় অঞ্চল, নদীর মোহনাসহ যেসব জেলা ও নদীতে ইলিশ পাওয়া যায়, সেখানে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকবে। এর আগে টানা ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা বলবত্ ছিল। ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম মূলত দুটি—সেপ্টেম্বর-অক্টোবর (ভাদ্র থেকে মধ্য কার্তিক) ও জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি (মধ্য পৌষ থেকে মধ্য ফাল্গুন)। তবে দ্বিতীয় মৌসুমের তুলনায় প্রথম মৌসুমে প্রজনন হার বেশি। মত্স্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে ইলিশের গতিপথ। বৃষ্টি বেশি হলে নদীতে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে ইলিশের আমদানিও বাড়ে।

যদিও ইলিশ লবণাক্ত জলের মাছ বা সামুদ্রিক মাছ; বেশিরভাগ সময় সে সাগরে থাকে, কিন্তু ডিম পাড়ার জন্য দীর্ঘপথ অতিক্রম করে নদীতে আসে। বঙ্গোপসাগর থেকে নদীর সাধারণ দূরত্ব ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটার। ইলিশ প্রধানত পদ্মা, মেঘনা এবং গোদাবরী নদীতে প্রচুর পাওয়া যায় এবং প্রজননের জন্য এলাকাটিকে বেছে নেয়। ইলিশ মাছ সাগর থেকেও ধরা হয়, কিন্তু সাগরের ইলিশ নদীর মতো সুস্বাদু নয়।

ইলিশ অর্থনৈতিকভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় মাছ। বঙ্গোপসাগরের ব-দ্বীপাঞ্চল, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা নদীর মোহনার হাওর থেকে প্রতি বছর প্রচুর ইলিশ মাছ ধরা হয়। সমপ্রতি দীর্ঘ ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে এ বছরও বাজারে বেশ ভালো ও বড় আকারের প্রচুর ইলিশ পাওয়া গেছে। ইলিশের আকার, দাম ও প্রাচুর্য দেখে মনে হয়েছে, ইলিশের সেই সুদিন আবার ফিরে এসেছে। বিগত বছরগুলোতে যে পরিমাণ ও ওজনের একটি ইলিশ মাছের দাম যা ছিল, তা এ বছর কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্ধেকেরও কমে চলে এসেছে। তা ছাড়া দেড়-দুই কেজির ওজনের ইলিশও বাজারে দেখা গেছে, আগে যা ছিল স্বপ্নের মতো।

এই ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার সময়ে অভিযান ও তদারকি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সংশ্লি­ষ্ট ৩৬টি জেলার সব নদ-নদীতে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দিনে ও রাতে অভিযান এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। প্রধান প্রজনন মৌসুমে ইলিশ আহরণ এবং জাটকা ধরা নিষিদ্ধ। এ সময়ে জেলেদের পরিবার প্রতি ৪০ কেজি হারে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

মত্স্যবিজ্ঞানীদের মতে, বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে যদি এসব নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়—তবে প্রতি বছরই ইলিশ মাছ এভাবেই সবার জন্য সহজলভ্য হবে। এতে করে বাংলাদেশের জাতীয় মাছ হিসেবে পরিচিত ইলিশের হারানো গৌরব ফিরতে খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন হবে না। এজন্য মাঠ প্রশাসনের সুষ্ঠু তদারকির পাশাপাশি কঠোর নজরদারি যেমন দরকার, ঠিক একইসঙ্গে ক্রেতা-বিক্রেতা ও জেলেদের সচেতন হওয়া একান্ত জরুরি।

ঢাকা