হিমায়িত চিংড়ি

পাঁচ বছরে রপ্তানি কমে ৪০ হাজার মেট্রিক টন

বাংলাদেশ থেকে হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি কমছে। গত পাঁচ বছরে চিংড়ি রপ্তানি কমে এখন প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টনে এসে দাঁড়িয়েছে। অবকাঠামোগত অসুবিধা, অন্য দেশে উত্পাদিত কম দামি ভেনামি চিংড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারা, আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা করা এবং বেশ কিছু প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রপ্তানি কমে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দাবি করেছেন। রপ্তানিকারক ও চিংড়ি চাষিরা বলছেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের সাদা সোনা খ্যাত চিংড়ি শিল্পের টিকে থাকা কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে।

দেশের ১ কোটি ৪৬ লাখ ৯৭ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চিংড়ি ও সাদা মাছ চাষ, বেচাকেনা, প্রক্রিয়াকরণ এবং রপ্তানি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত। এদের অধিকাংশই বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলের মানুষ। বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো ও বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএফইএ) সূত্র জানায়, গত ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ৩৯ হাজার ৭০৬ মেট্রিক টন চিংড়ি বিদেশে রপ্তানি করা হয়। এ থেকে আয় হয়েছে  ৪৫৭ মিলিয়ন ডলার। এর আগের বছর ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে চিংড়ি রপ্তানি করা  হয় ৪০ হাজার ৭২৬ মেট্রিক টন।  এ বছর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হয় ৪ হাজার ৪৫৯ মিলিয়ন ডলার। ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে রপ্তানি হয়েছে ৪৪ হাজার ২৭৮ মেট্রিক টন চিংড়ি। এ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে ৫০৬ মিলিয়ন ডলার। ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে চিংড়ি রপ্তানি হয়েছে ৪৭ হাজার ৬৩৫ মেট্রিক টন। এ বছর বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে ৫৩১ মিলিয়ন ডলার। ২০১২-১৩ অর্থ বছরে চিংড়ি রপ্তানি করা হয় ৫০ হাজার ৩৩৩ মেট্রিক টন। এ বছর চিংড়ির আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম থাকায় আয় হয়েছে ৪৩৪ মিলিয়ন ডলার। সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে চিংড়ি ও সাদা মাছ মিলিয়ে রপ্তানি করা হয় ১৫২ মিলিয়ন পাউন্ড। এ থেকে আয় হয় ৫০৮ মিলিয়ন ডলার। যা টাকার অঙ্কে ৪ হাজার ৮ কোটি টাকা। এ বছর চিংড়ির আলাদা কোনো তথ্য দিতে পারেনি বিএফএফইএ। তবে তাদের ধারণা ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের মতো সমপরিমাণ চিংড়ি বিদেশে রপ্তানি হয়েছে।

এদিকে পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ সালে ২ লাখ ৭২ হাজার ৭১৭ হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হয়। সেখান থেকে চিংড়ি উত্পাদনের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৪৫ হাজার ১১৭ মেট্রিক টন। ২০১৫-১৬ সালে চিংড়ি চাষ হয় ২ লাখ ৭৫ হাজার ৫০৯ হেক্টর জমিতে। এ সময় চিংড়ি উত্পাদন হয় ২ লাখ ৩৪ হাজার ১৮৮ মেট্রিক টন। ২০১৪-১৫ সালে ২ লাখ ৭৫ হাজার ৫৮৩ হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হয়। সেখান থেকে চিংড়ি উত্পাদনের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার ২৪৪ মেট্রিক টন।  এছাড়া  ২০১২-১৩ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে মোট ২ লাখ ৭৫ হাজার ২৭৪ হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হয়। এ বছর উক্ত জমি থেকে চিংড়ি উত্পাদিত হয় ২ লাখ ৩১ হাজার ৮৪২ মেট্রিক টন। ঐ বছর চাষযোগ্য আরো ১ লাখ হেক্টর জমি অব্যবহূত থাকে। কিন্তু পরে চিংড়ি চাষে খুব বেশি জমি যুক্ত হয়নি বলে পরিসংখ্যান সূত্রে জানা যায়।

মত্স্যচাষি মনিরুল ইসলাম কাগজী বলেন, গত মৌসুমে (২০১৭-১৮) অর্থ বছরে আবহাওয়া প্রতিকূল থাকায় চিংড়ি চাষিরা অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘেরের পানির গভীরতা কমে যাওয়া, তাপমাত্রা ও চাষের ব্যয় বৃদ্ধি, ভাইরাস সংক্রমণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চাষিরা চিংড়ি চাষ থেকে সরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি বলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এখন আর চাষিদের টিকিয়ে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব না।

বিএফএফইএর সাবেক পরিচালক এস হুমায়ুন কবির ইত্তেফাককে বলেন, ২০২১ সাল নাগাদ চিংড়ি শিল্প থেকে আমাদের ১.৫ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার কারণে আমরা সেটা অর্জন করতে পারব না। বাংলাদেশের চিংড়ির স্বাদ ও গুণগত মান ভালো হলেও দাম বেশি। ফলে বিশ্বের নামি-দামি রেস্টুরেন্ট ছাড়া এই চিংড়ি কেউ কেনে না। সেখানে বাংলাদেশি চিংড়ির জায়গা দখল করে নিয়েছে অন্য দেশের উত্পাদিত কম দামি ভেনামি চিংড়ি।

খুলনা মত্স্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, উত্পাদন ঘাটতির কারণে বিদেশে চিংড়ি রপ্তানি কমে যেতে পারে। এছাড়া উপকূলীয় এলাকায় চিংড়ি চাষে অবকাঠামোগত অসুবিধা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও খাবার ব্যবস্থাপনাসহ নানামুখী সংকটে চিংড়ি উত্পাদন কমে যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।