শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা, আর্থিক ব্যবস্থা তদারকি, লেখাপড়ার মান ও পরিবেশ নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ধারণা থেকে গভর্নিং বডি বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। অথচ গভর্নিং বডির অধিকাংশ সদস্যই নিজেদের পকেট ভারী করার উত্স হিসেবেই দেখছে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজকে। এতে শিক্ষার মান বাড়ার পরিবর্তে দেশের ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের বোঝা বাড়ছে। সাবেক অধ্যক্ষ, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টরা প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা উন্নয়নের পথে বাধা হিসেবে দেখছে গভর্নিং বডিকে।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল ঢাকার বেইলি রোডে অবস্থিত মেয়েদের একটি স্বনামধন্য স্কুল। ১৯৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমানে স্বাধীন বাংলাদেশ) গভর্নর ফিরোজ খান নূনের সহধর্মিণী ভিকার উন নিসা নূন ঢাকায় মেয়েদের একটি আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুরু করার লক্ষ্যে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন ও তার নামানুসারেই স্কুলটির নামকরণ করা হয়েছে। শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানটি সুনামের সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করলেও এখন প্রতিষ্ঠানটি অনিয়মের ক্ষেত্রেও এগিয়ে আছে। অনিয়মের প্রতিবাদে গভর্নিং বডির সভাপতিসহ অন্যদের বিরুদ্ধে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন একই বডির সদস্য অ্যাডভোকেট ইউনূস আলী আকন্দ।
সম্প্রতি গভর্নিং বডির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এ কারণে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সভাপতি ও শিক্ষা ক্যাডারের এক কর্মকর্তাকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রাক্তন একাধিক অধ্যক্ষ এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, অতীতের সব কাজেই প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডি অযাচিত হস্তক্ষেপ করেছিল। সম্প্রতি শেষ হওয়া গভর্নিং বডির চিত্রও ছিল একই। তাদের অযাচিত হস্তক্ষেপে প্রতিষ্ঠানের নিয়ম-শৃঙ্খলা বাধাগ্রস্ত হতো। অবসরপ্রাপ্ত এক অধ্যক্ষ জানান, গভর্নিং বডির বাইরে গিয়ে অধ্যক্ষ বা অন্য শিক্ষকদের কিছুই করার থাকে না। গভর্নিং বডির সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কিছু করলেই অধ্যক্ষকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে গভর্নিং বডির অনুগত থাকতে হয় অধ্যক্ষকে। প্রতিষ্ঠানটিতে সব ধরনের অনিয়মের সঙ্গেই জড়িত গভর্নিং বডির কতিপয় সদস্য। নিয়োগ ও ভর্তির মাধ্যমেই বেশি অনিয়ম করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আর্থিক অনিয়মেরও অভিযোগ উঠেছে। কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই যেমন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আবার একইভাবে অনিয়ম করে বিভিন্ন শ্রেণিতে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে।
নিয়ম না মেনে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর কারণে এক শ্রেণিতে ৮০ থেকে ৯০ জন করে শিক্ষার্থীকে গাদাগাদি করেই শ্রেণিকক্ষে বসতে হয়। কোনো কোনো শ্রেণির হাজিরা নিতে নিতেই সময় পার হয়ে যায়। আবার শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী থাকায় পাঠদানে যেমন শিক্ষকরা মনোযোগী হতে পারেন না, তেমন ছাত্রীদের ক্ষেত্রে একই সমস্যা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানে আসা-যাওয়া ছাড়া কোনো পাঠদান হয় বলে মনে করেন না আমিরুল ইসলাম নামে এক অভিভাবক।
প্রতিষ্ঠানটিতে বেশি অনিয়ম করে থাকে ভর্তির ক্ষেত্রে। অভিযোগ আছে, আর্থিক সুবিধা নিয়েই অধিকাংশ ভর্তি হয়। চলতি বছর অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে ৪ শতাধিক। এর আগের বছর ২০১৮ সালে অতিরিক্ত ভর্তি করা হয় দুই শতাধিক। প্রতিবছরই নিয়মের বাইরে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে। চলতি বছর ভর্তিতে নিজেদের মতো কোটা নেন গভর্নিং বডির অনেক সদস্যই।
অনিয়মের মাধ্যমে দুদকের এক পরিচালকের স্ত্রীকে নিয়োগ দিতে চেয়েছিল গভর্নিং বডি। এ কারণে গঠিত তদন্ত কমিটি অনিয়মের প্রমাণও পায়। পরবর্তীতে ঘুষ দুর্নীতির দায়ে দুদকের ঐ পরিচালক এনামুল বাছির বরখাস্ত হয়েছিলেন। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় এই নিয়োগ বাতিল করে মন্ত্রণালয়। এ নিয়োগে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) প্রতিনিধি ছিলেন সংস্থাটির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) অধ্যাপক শাহেদুল খবীর চৌধুরী।
সম্প্রতি শেষ হওয়া গভর্নিং বডির সদস্য অ্যাডভোকেট ইউনূস আলী আকন্দ বলেন, আমি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নই। শুধু তাই নয়, নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চারও ছিলাম। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত অন্যায়ের প্রতিবাদে ৮০টির বেশি লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছি। নোট অব ডিসেন্টও দিয়েছি অসংখ্য।
তিনি বলেন, কোনো নিয়ম না মেনেই বসুন্ধরা শাখায় ১৪ জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সেখানে কোনো আইনকানুন মানা হয়নি। শিক্ষক নিবন্ধন সনদ নাই তবুও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী ৩৫ বছরের বেশি বয়স হলে নিয়োগযোগ্য হবেন না, কিন্তু বয়স ৫০ বছর এমন প্রার্থীকেও শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দুইটি পদের বিপরীতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তিন জন। সর্বনিম্ন নম্বর পাওয়া এক প্রার্থীকে ১০ নম্বর বাড়িয়ে দিয়ে সর্বোচ্চ করে নিয়োগের চেষ্টা করেছিল। শিক্ষক পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো নিয়মনীতি মানেনি। কিন্তু তাতে আমি বাধা দিয়েছি। আপত্তি করেছি। কিন্তু একা প্রতিবাদ করে সফল হইনি। আমার পক্ষে গভর্নিং বডির কোনো সদস্য ছিলেন না।
তথ্য অনুযায়ী, আগে ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্থানীয় সংসদ সদস্যরা সভাপতি হতেন। সে অনুযায়ী বতর্মান সরকারের সময়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন সভাপতি ছিলেন। আইনি বাধ্যবাধকতা থাকায় রাশেদ খান মেনন এই পদে দায়িত্ব পালন না করলেও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম আশরাফ তালুকদার সভাপতি হন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব সময়ই গভর্নিং বডি নিয়ে বিতর্ক ছিল।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক অনিয়মে ক্ষুব্ধ। বছরের বেশিরভাগ সময়ই প্রতিষ্ঠানটির নানা অনিয়মে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে মন্ত্রণালয়কে। বর্তমানে এডহক কমিটি প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছে। মন্ত্রণালয় বাধ্য হয়ে কমিটির সভাপতি হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নাজমুল হক খান এবং অধ্যক্ষ হিসেবে শিক্ষা ক্যাডারের ফওজিয়াকে প্রেষণে নিয়োগ দেয়।