বুয়েটে রাজনীতি নিষিদ্ধ

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) সব ধরনের রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বিকালে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠকে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম নিজের ক্ষমতাবলে ক্যাম্পাসে ছাত্র ও শিক্ষকদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করেন। একই সঙ্গে বৈঠকে আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত ১৯ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ১০ দফা দাবির সব কয়টি মেনে নিয়েছেন উপাচার্য। তবে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য দাবিগুলো বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

এর আগে প্রতিদিনের মতো বেলা ১১টা থেকে বুয়েটের শহিদ মিনার এলাকায় জড়ো হয়ে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিল শেষে শহিদ মিনারের সামনের চত্বরে বসে স্লোগান দেন তারা। দুপুর ২টায় সেখানে টকশোর আয়োজন করা হয়। পরে বিকাল ৫টায় ভিসির বৈঠকে যোগ দিতে লাইনে দাঁড়ান শিক্ষার্থীরা। একে একে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র দেখিয়ে ভেতরে ঢুকতে হয়েছে। বিকাল ৫টা ২২ মিনিটে বুয়েটের উপাচার্য অডিটোরিয়ামে প্রবেশ করেন। শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও বিভিন্ন অনুষদের ডিনরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। পরে বৈঠকে ১০ দফা দাবি ও আবরার হত্যার ঘটনায় উঠে আসা ইস্যুগুলো নিয়ে ভিসির কাছে জবাব চাওয়া হয়।

আলোচনার শুরুতেই উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম নিজের ভূমিকার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়েছেন। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমার কিছুটা ভুল হয়েছে, আমি তোমাদের কাছে ক্ষমা  প্রার্থনা করছি। তোমরা আমাকে ক্ষমা করে দাও।’ উপাচার্য বলেন, ‘আবরার আমার সন্তানের মতো ছিল। তোমাদের যেমন কষ্ট লাগছে, তার মৃত্যুতে আমারও অনেক খারাপ লেগেছে। এটি আমি মেনে নিতে পারিনি। আমরা সবাই মর্মাহত।’

আবরার হত্যা মামলার খরচ বহন ও ক্ষতিপূরণের বিষয়ে ভিসি বলেন, ‘আবরারের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে এবং মামলার খরচ বুয়েট কর্তৃপক্ষ বহন করবে। এছাড়া বিচারকাজ দ্রুত শেষ করতে সরকারকে চিঠি দেওয়া হবে।’ হলগুলোয় র্যাগিংয়ের নামে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের বিষয়ে দ্রুততম সময়ে তদন্ত কমিটি করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়ে ভিসি বলেন, ‘দ্রুততম সময়ের মধ্যে ক্যাম্পাসে সিসিটিভি বসানো হবে। এর জন্য সময়ের প্রয়োজন রয়েছে।’

আলোচনা শেষ হওয়ার পর রাত সাড়ে ১০টায় নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানাতে সংবাদ সম্মেলন করেন শিক্ষার্থীরা। তারা জানান, তাদের দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন্ন ভর্তি পরীক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা স্বল্পসময়ে বাস্তবায়নযোগ্য পাঁচটি পয়েন্ট তুলে ধরেছেন। এই পয়েন্টগুলো বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার মতো নিরাপদ পরিবেশ বুয়েট ক্যাম্পাসে নেই। শিক্ষার্থীদের দেওয়া পয়েন্টগুলো হলো; ১. আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে এখন থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করতে হবে এবং যাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট গঠন করা হবে তাদের অবিলম্বে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করার মর্মে একটা নোটিশ প্রদান করতে হবে। ২. আবরার হত্যা মামলার সম্পূর্ণ খরচ বুয়েট প্রশাসনকে বহন করতে হবে এবং আবরারের পরিবারকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই মর্মে নোটিশ দিতে হবে। ৩. বুয়েটে সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করে সব হলে অবৈধ ছাত্র উত্খাত করতে হবে এবং অবৈধভাবে হলে সিট দখলকারীদের উত্খাত করতে হবে। সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতির অফিসগুলো সিলগালা করতে হবে। ৪. বুয়েটে পূর্বে ঘটে যাওয়া সব ছাত্র নির্যাতন এবং হয়রানি এবং ভবিষ্যতে এরূপ যে কোনো ঘটনা প্রকাশের জন্য একটি কমন প্ল্যাটফর্ম সংযুক্ত করতে হবে এবং এর পূর্ণ মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করে শাস্তি প্রদানের জন্য একটি কমিটি গঠন করতে হবে। এ বিষয়ে নোটিশের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। ৫. প্রত্যেক হলের সব ফ্লোরে সব উইংয়ের দুইপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা যুক্ত করতে হবে এবং এই সিসিটিভি ফুটেজ ২৪ ঘণ্টা সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। এই মর্মে নোটিশ দিতে হবে।

ছাত্র ও শিক্ষকদের রাজনীতি নিষিদ্ধ :বৈঠকে উপাচার্য নিজের ক্ষমতাবলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সব ধরনের ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। শিক্ষার্থীদের দাবি উত্থাপনের পর এ ঘোষণা দেন উপাচার্য। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমার নিজ ক্ষমতায় বুয়েটের সব রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনের কর্মকান্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করছি।’ উপাচার্যের এ ঘোষণার পরপরই জোর করতালিতে এ সিদ্ধান্তকে অভিনন্দন জানান শিক্ষার্থীরা। উপাচার্য বলেন, ‘এখন থেকে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে ডিসিপ্লিনারি বোর্ডের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ একই সঙ্গে শিক্ষকদের রাজনীতিও নিষিদ্ধ করা হয়। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ভিসি ছাত্ররাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষকদের রাজনীতিও নিষিদ্ধ করার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

যে ১৯ আসামি সাময়িক বহিষ্কার :হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত সন্দেহে এজহারভুক্ত ১৯ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বুয়েটের উপাচার্য। আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে রবিবার চকবাজার থানায় এই মামলা করেন। মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা প্রত্যকেই বুয়েটের শিক্ষার্থী এবং ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এরা হলেন ছাত্রলীগের বুয়েট শাখার সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল, সহসভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার, সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন, উপসমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশারফ সকাল, সাহিত্য সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির, ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, সদস্য মাজেদুল ইসলাম, মোজাহিদুল ওরফে মোজাহিদুর রহমান, তানভীর আহম্মেদ, হোসেন মোহাম্মদ তোহা, জিসান, আকাশ, শামীম বিল্লাহ, শাদাত, এহতেশামুল রাব্বি তানিম, মোর্শেদ, মোয়াজ ও  মুনতাসির আল জেমি।