বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলাটি দ্রুত বিচারের চিন্তা করছে সরকার। এরই মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় দ্রুততম সময়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে আসামিদের। নেওয়া হয়েছে রিমান্ডে। রিমান্ডে থাকা দুই আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে নৃশংসভাবে উঠে এসেছে আবরার হত্যার চিত্র। এদিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে মাঠে রয়েছে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সভায় বুয়েটের ভিসি জানান, এই হত্যার বিচার দ্রুত শেষ করতে সরকারকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হবে। একই দিনে আবরার হত্যা মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে করার দাবি জানিয়েছে ১৪ দল।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত হওয়া উচিত। এজন্য আইনসম্মতভাবে বিচার দ্রুত শেষ করতে যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার তা-ই করবে।’ তিনি বলেন, ‘যেসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করে সমাজে একটা বার্তা পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন, সেই সব মামলা দ্রুত সম্পন্নে একটা আইন রয়েছে। আমরা নিশ্চয়ই সে বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছি। ন্যায়বিচার যেন শুধু মুখের বুলি না হয়, ন্যায়বিচার যেন কাগজে দেখা যায়, সেই ব্যবস্থা সরকার করছে।
আবরার হত্যাকাণ্ডের ঠিক সাত বছর আগে ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর পুরান ঢাকায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয় দর্জিদোকানি বিশ্বজিতকে। এক বছরের মধ্যে এই মামলায় ছাত্রলীগের আট জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ১৩ জনকে যাবজ্জীবন সাজা দেয় ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪। ২০১৫ সালের জুলাই মাসে সিলেটে শিশু রাজন ও খুলনায় রাকিবকে হত্যা করা হয়। এ দুটি হত্যাকাণ্ডের পর দেশ জুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। তখনই সরকার দ্রুততম সময়ে বিচার সম্পন্নের কথা জানায়। এরই ধারাবাহিকতায় ঐ বছরের নভেম্বরে রাজন হত্যা মামলা ১৯ কার্যদিবসে এবং ১১ কার্যদিবসে রাকিব হত্যা মামলার বিচার শেষ করে মহানগর দায়রা জজ আদালত। ঐ রায়ে ছয় জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বগুড়া থেকে ময়মনসিংহে যাওয়ার পথে বাসে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হন রূপা খাতুন। এ ঘটনায় করা মামলায় গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি বাসের চালকসহ চার সহকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেয় টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। সর্বশেষ গত ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় করা মামলার শুনানি ৬২ কার্যদিবস, অর্থাত্ ছয় মাসে শেষ হয়। আগামী ২৪ অক্টোবর ১৬ আসামির বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করবে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল।
আইন বিশেষজ্ঞরা জানান, শুরু থেকেই সরকার এসব মামলাকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্বল্প সময়ের মধ্যে আসামি গ্রেপ্তার, আলামত জব্দ এবং আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করতে সক্ষম হয়। এর ফলে অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে দ্রুত রায় দেন বিচারকেরা। তবে চাঞ্চল্যকর এসব হত্যা মামলার বিচার নিম্ন আদালতে দ্রুত শেষ হলেও বিচারের আরো দুটি ধাপ অতিবাহিত না হওয়ায় ফাঁসির রায় কার্যকর করা যায়নি।
এদিকে আবরার হত্যাকাণ্ডের পর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেয় সরকার। বিষয়টি জানার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জড়িতদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেন। নিউ ইয়র্ক ও ভারত সফর শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কে ছাত্রলীগ, কে ছাত্রদল, কী করে তা আমি বিবেচনায় নিইনি। অন্যায়ভাবে একটি ছেলেকে পিটিয়ে মারা কী অমানবিক! অপরাধী অপরাধীই, তার বিচার হবে।’