প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলনের মুখে বুয়েট কর্তৃপক্ষ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সব দাবি মেনে নিয়েছে। তারপরও আন্দোলন কেন? এখন আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা কি? গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে মহিলা শ্রমিক লীগের কাউন্সিলের উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ প্রশ্ন তোলেন।
শিক্ষাঙ্গনে অন্যায়কারী যে কারো বিরুদ্ধেই কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের কথা স্পষ্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ রাখতে হবে। কোনো অন্যায়- অবিচার আমরা সহ্য করি নাই, ভবিষ্যতেও করব না। অপরাধী যেই হোক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’
বুয়েট ছাত্র আবরার হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতারে তার সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘খবরটা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি কারো আন্দোলন বা নির্দেশের অপেক্ষা করিনি। আমি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছি—ওদেরকে গ্রেফতার করো এবং ভিডিও ফুটেজ থেকে সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করো।’ এই তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে তদন্তে বিঘ্ন সৃষ্টির উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পুলিশের ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহের সময় তারা (আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী) কেন বাধা দিয়েছিল আমি জানি না। এর মাধ্যমে আসামিদের পালিয়ে যাওয়ার একটি সুযোগই করে দেওয়া হয় কি-না সেটা আন্দোলনকারীরা বলতে পারবে।’
জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া এবং এইচ এম এরশাদের আমলে একের পর এক ছাত্র হত্যার ঘটনা ঘটলেও একটিরও বিচার হয়নি, কেবল আওয়ামী লীগই বিচার করেছে বলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বুয়েটে ছাত্রদলের টগর ও মুকী গ্রুপের সংঘর্ষে সাবেকুন্নাহার সনি নিহত হলো, তখন কে প্রতিবাদ করেছে? বুয়েটের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন তারাও নামে নাই, তাদেরও তো কথা বলতে বা কোনো প্রতিবাদ করতে দেখিনি। তিনি বলেন, হ্যাঁ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে সবার কথা বলার অধিকার আছে, বলতে পারে। অন্তত সেই সুযোগটা আছে। কিন্তু যখন জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় ছিল জাতির পিতার খুনিদের পুরস্কৃত করেছে, যুদ্ধাপরাধী এবং সাত খুনের আসামিকে ছেড়ে দিয়েছে—তার প্রতিবাদ কে করেছে? তখন মানবাধিকারের চিন্তা কোথায় ছিল? তখন ন্যায়-নীতিবোধ কোথায় ছিল? তাদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা।
অনুষ্ঠানে সম্প্রতি সম্পাদিত বাংলাদেশ-ভারত চুক্তির প্রেক্ষাপট ও যৌক্তিকতা তুলে ধরে এর অহেতুক সমালোচকদের কঠোর সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ভারতের থেকে যদি কেউ ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে পারে তবে তা আওয়ামী লীগ সরকারই করেছে।’ এ বিষয়ে তিনি গঙ্গার পানি চুক্তি, স্থল সীমানা চুক্তি করে ছিটমহল বিনিময় এবং সমুদ্রসীমায় আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার সরকারের সাফল্য তুলে ধরেন। শেখ হাসিনা তার সাম্প্রতিক ভারত সফরে দুই দেশের মধ্যকার চুক্তি সম্পর্কে বলেন, ‘লাভ-ক্ষতির হিসেব করলে এখানে বাংলাদেশেরই লাভ বেশি। কাজেই মানুষের মাঝে একটা বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য জেনে শুনেই জ্ঞানপাপীরা কথা বলে যাচ্ছেন।’
তার সরকারের সময়ে দেশে নারীর ক্ষমতায়নের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু চাকরির ক্ষেত্রেই নয়, আমরা চাই ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা গড়ে তোলায় নারীরা চলমান বিশ্বের প্রতিযোগিতায় নিজেদেরকে যেন মেলে ধরতে পারে—বর্তমান সরকার তার সুযোগ করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘সমাজকে পালটে ফেলে নারী-পুরুষের সমান অধিকার আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি। আর সুযোগ পেলে আমাদের নারীরা যে তাদের দক্ষতার প্রমাণ রাখতে পারে সেটা আজকে প্রমাণিত সত্য।’ এসময় তিনি সেনা, নৌ, বিমান বাহিনী, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনসহ পেশাগত বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের সাফল্যের উদাহরণের কথা তুলে ধরেন।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন। মহিলা শ্রমিক লীগের সভাপতি রওশান জাহান সাথী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এবং দলের সাধারণ সম্পাদক বেগম শামসুন্নাহার ভূঁইয়া এমপি সংগঠনের সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন। দলের কার্যকরী সভাপতি এবং সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক সুরাইয়া আক্তার স্বাগত বক্তৃতা করেন। এরআগে প্রধানমন্ত্রী বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে মহিলা শ্রমিক লীগের কাউন্সিলের উদ্বোধন করেন এবং জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।
মহিলা শ্রমিক লীগের সভাপতি সুরাইয়া, সম্পাদক রহিমা
মহিলা শ্রমিক লীগের কাউন্সিলে সংগঠনের নতুন সভাপতি মনোনীত হয়েছেন সুরাইয়া আক্তার ও সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন কাজী রহিমা আক্তার সাথী। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এই কমিটির নেতারা ৪৫ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করবেন। সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছাড়াও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গির কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।