বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার চার্জশিট তৈরির কাজ শুরু করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহেই চার্জশিট দাখিল করা হবে বলে ইত্তেফাককে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মাহবুব আলম। চার্জশিটে এজাহারভুক্ত ১৯ জনকেই আসামি করা হচ্ছে। এর সঙ্গে আরো চার জন যুক্ত হচ্ছেন। সব মিলিয়ে চার্জশিটভুক্ত আসামি হচ্ছেন ২৩ জন। ২০ জনকে সাক্ষী করা হচ্ছে। এদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী। গতকাল রবিবার মুজাহিদ নামে এক ছাত্র ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত চার জন স্বীকারোক্তি দিলেন। গতকাল শামীম ও মোয়াজ নামে আরো দুই জনকে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।
যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম বলেন, ‘আবরার ফাহাদ হত্যা মামলাটি সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তদন্ত করছে ডিবি। অধিকাংশ আসামি গ্রেফতার হয়েছে। দুই-একজন এখনো গ্রেফতার হয়নি, তাদের গ্রেফতারে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। গ্রেফতারকৃত আসামিরা হত্যাকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ত করে স্বীকারোক্তিও দিয়েছে। পুরো বিষয়টি এখন পরিষ্কার। আমরা এজাহারভুক্ত ১৯ জনের বাইরে আরো চার জনের সম্পৃক্ততা পেয়েছি। সবাইকেই চার্জশিটে আসামি করা হচ্ছে। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই আমরা আদালতে চার্জশিট দাখিল করব, সেই প্রস্তুতিই চলছে।’
তদন্তকারী দলের একজন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেছেন, ‘অভিযুক্ত সবাই খুনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়। নির্দেশদাতা এবং উসকানিদাতাও আছে। সবাই সমান অপরাধী। অভিযুক্তদের যাতে শাস্তি নিশ্চিত করা যায়, সে জন্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করেই চার্জশিট প্রস্তুত করা হচ্ছে। অভিযুক্ত কেউই রেহাই পাবে না।’
চার্জশিটে যারা আসামি হচ্ছেন :বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল (২৪), সহসভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ (২৩), তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার (২২), সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন (২২), উপসমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশারফ সকাল (২১), সাহিত্য সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির (২১), ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন (২২), সদস্য মুনতাসির আল জেমি (২০), সদস্য মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ (২১), সদস্য এহতেশামুল রাব্বি তানিম (২০) এবং মাজেদুল ইসলাম (২১), তানভীর আহম্মেদ (২১), হুসেইন মোহাম্মদ তোহা (২০), জিসান (২১), আকাশ হোসেন (২১), শামীম বিল্লাহ (২০), শাদাত (২০), মোর্শেদ (২০) ও মোয়াজ আবু হুরায়রা (২০)। এদের ১৫ জনকে গ্রেফতার করেছে ডিবি। চার জন পলাতক আছেন। তারা হলেন জিসান, শাদাত, মোর্শেদ ও এহতেশামুল রাব্বি তানিম। তাদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে ডিবি জানিয়েছে।
এর বাইরে যে চার জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, তারা হলেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের গ্রন্থনা ও গবেষণা সম্পাদক ইশতিয়াক মুন্না, আইনবিষয়ক উপসম্পাদক অমিত সাহা, আবরারের রুমমেট মিজানুর রহমান মিজান ও শামসুল আরেফিন আরাফাত। এই চার জনকেই ইতিমধ্যে গ্রেফতার করেছে ডিবি। তাদের সম্পৃক্ততাও মিলেছে।
শামীম ও মোয়াজ রিমান্ডে :আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় গ্রেফতার শামীম বিল্লাহ ও মোয়াজ আবু হুরায়রাকে পাঁচ দিন করে রিমান্ডে নিয়েছে ডিবি। গতকাল তাদের আদালতে হাজির করলে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশিদ শুনানি শেষে রিমান্ডের এই আদেশ দেন। মামলার তদন্তকারী ও ডিবি পুলিশ পরিদর্শক ওয়াহিদুজ্জামান ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে আসামিদের আদালতে হাজির করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হেমায়েত উদ্দিন খান শুনানিতে অংশ নেন। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিলের আবেদন করেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক প্রত্যেকের পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এবার মুজাহিদের স্বীকারোক্তি :আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় রিমান্ডে থাকা বুয়েটের ছাত্র মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মুজাহিদ বুয়েট ছাত্রলীগের সদস্য ছিলেন। গত ৬ অক্টোবর আবরার খুন হওয়ার পরপরই যে ১০ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছিল, তাদের মধ্যে মুজাহিদ একজন। গতকাল মুজাহিদকে ঢাকার আদালতে হাজির করা হলে মহানগর হাকিম নিভানা খায়ের জেসি তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। আদালতের পেশকার জাহিদ হাসান বলেন, মুজাহিদ অপরাধে সংশ্লিষ্টতা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। মুজাহিদ স্বীকারোক্তিতে বলেছেন, ‘আবরারকে আমিও স্কিপিং দড়ি দিয়ে পিটিয়েছে। তবে আবরারকে স্টাম্প দিয়ে সবচেয়ে বেশি পিটিয়েছে অনিক সরকার। এছাড়া রবিন, সকালসহ অন্যরাও কমবেশি চড়-থাপ্পড় ও মারধর করেছে।’ এ নিয়ে চার জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা হলেন বুয়েটের ছাত্র ইফতি মোশাররফ সকাল, মেফতাহুল ইসলাম জিওন, অনিক সরকার ও সর্বশেষ মুজাহিদ।