পুটিজুরী এস.সি.উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক মূল্যায়ন

 ‘বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধকে জানি’

জাতীয় শিক্ষাক্রমের আলোকে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা বিষয়ক পাঠ্যপুস্তকে বর্ণিত ‘বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ’ বিষয়টিকে ধারাবাহিক মূল্যায়নের একটি কার্যকরী পন্থা উদ্ভাবন করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর। যার মাধ্যমে ‘বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ’ বিষয়ে শিখন ফলের চূড়ান্ত মূল্যায়ন বা অর্জন মাপা সম্ভব। দেশব্যাপী সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে চলমান এই কার্যক্রমের শিরোনাম  দেয়া হয়েছে ‘ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধকে জানি’। এই ধারাবাহিক মূল্যায়নে দুইটি বিষয় অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে এক. এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি, দুই. ভিডিও চিত্র ধারণ। সম্ভাব্য নমুনা প্রশ্নের আলোকে মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাত্কারের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য, স্মৃতিচারণ, সাহসিকতার গল্প নিয়ে শিক্ষার্থীরা তৈরি করছে প্রতিবেদন এবং ভিডিও। আর এর মধ্যে বাছাই করা প্রতিবেদনগুলো দৈনিক ইত্তেফাক-এর শিক্ষা বিষয়ক পাতা অনুশীলন-এ প্রকাশিত হবে ধারাবাহিকভাবে।  আজ হবিগঞ্জের পুটিজুরী এস.সি.উচ্চ বিদ্যালয়ের  শিক্ষার্থীদের নেয়া  মুক্তিযোদ্ধা মেজর তাহের উদ্দিন আখঞ্জি (অব:)-এর সাক্ষাত্কার থেকে তৈরি করা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হলো। প্রশ্নকর্তা, ভিডিও এবং প্রতিবেদন তৈরিতে ছিলো সপ্তম শ্রেণির  শিমলা আক্তার, ইসরাত জাহান তানজিয়া, শেখ সুমাইয়া আক্তার, শ্রেষ্ঠা পাল, চৈতী রানী দাস পায়েল, বর্ণা পাল, মোছা. তামান্না আক্তার,  মুমতাজ আক্তার মমি

মোছা. তানিয়া আক্তার,জান্নাতুল চাদনী। সাক্ষাত্কার গ্রহণে সহায়তা করেন বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পংকজ কান্তি গোপ। 

লিখিত প্রতিবেদন পাঠানোর ঠিকানা ই-মেইল: anushilon.ittefaq10@gmail.com  যোগাযোগ:০১৭১৪৭০৫৭২৭

গত রবিবারের পর

বাংলার স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধু ছিলেন আপোষহীন এবং বিজয় অর্জনের জন্য তাঁর ত্যাগের কাছে নিজের জীবনকে তিনি তুচ্ছ মনে করতেন।

রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বঙ্গবন্ধু অতি অল্প সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে ধ্বংসপ্রায় অবকাঠামো পুননির্মাণ, আর্থিক খাত পুনর্গঠন এবং সমগ্র বিশ্বের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছেন।

ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় প্রত্যয় ও প্রচেষ্টা অতুলনীয় ছিল বলেই অতি অল্প সময়েই একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ অতি দ্রুত পুনর্গঠিত হয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টে বঙ্গবন্ধুর সাথে স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব; ৩ পুত্র-শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল; পুত্রবধূ-সুলতানা কামাল ও পারভীন জামালসহ আত্মীয়-পরিজনের নির্মম হত্যাকাণ্ড বাঙালি জাতি এমনকি পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে দূর্ভাগ্যজনক ও কলঙ্কময় ঘটনা। বাঙালি জাতি এ ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে পড়ে এবং বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা সাময়িক স্তিমিত হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর কন্যা দেশে ফিরে পুনরায় হাল ধরেন।

 

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর ৩ মাসের মাথায় বঙ্গবন্ধুর সহযোদ্ধা জাতীয় ৪ নেতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে চিরতরে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশ প্রমাণ করে যে তাদের এই চেষ্টা সফল হয়নি।

 

বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যম বিবিসির বাংলা বিভাগের জরিপে বিশ্বের সকল প্রান্তের বাঙালির মত অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুকে ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়। 

 

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিলো ২২ বত্সর। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ব্যাপারে প্রথমে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ, পরবর্তীতে হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জের মাহবুবুর রব সাদী আমাকে মুক্তিযুদ্ধে যেতে প্রেরণা জোগায়। আমি প্রথমে ভারতের চন্দননগর ক্যাম্পে, পরবর্তীতে কমিশন অফিসার হিসেবে শিলিগুড়ির মূর্তি ট্রেনিং একাডেমিতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি।

১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে সিলেটের ভোলাগঞ্জ এলাকার ‘বর্ণি’ নামক গ্রামে একটি পাকিস্তান হানাদার ক্যাম্পে আক্রমণের জন্য আমি এক কোম্পানি মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে রাতের অন্ধকারে রওয়ানা দেই। বর্ণি গ্রামের কাছাকাছি পৌঁছা মাত্র একজন মুক্তিযোদ্ধা অসতর্কতা বশত: রাইফেলের গুলি ছুঁড়ে। সঙ্গে সঙ্গে বর্ণি গ্রামে স্থাপিত পাকিস্তান সেনাদের ক্যাম্প থেকে আমাদের দিকে অঝোর ধারায় গুলি আসতে থাকে। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা রাতের অন্ধকারে এদিক সেদিক যে যার মতো পৌঁছাতে থাকে। কমাণ্ড আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ফলে আমিও পেছাতে থাকি। কিছু বোঝার আগেই আমরা কয়েকজন পেছাতে গিয়ে একটি জলাশয় বিলে কাদার মধ্যে আটকে যাই। এমনভাবে আটকা পড়ি যে, কাদার মধ্যে কোমর পর্যন্ত ডেবে যায়। সামনের দিক থেকে অঝোরে গুলি বর্ষিত হচ্ছিল। আমি নিজেকে কাদার মধ্যে কচুরিপানা দিয়ে মাথা পর্যন্ত ঢেকে দেই। অনেকক্ষণ পর দেখলাম গুলি থেমে গেছে। এদিকে, আমাদের দলের পালিয়ে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের পেছনের ক্যাম্পে পৌঁছে পরিস্থিতির বর্ণনা দিলে ওই ক্যাম্প হতে অস্ত্রসস্ত্রসহ আরও কিছু মুক্তিযোদ্ধা আসে আমাদেরকে উদ্ধার করতে। কিন্তু তারা আমাদেরকে দেখতে না পেয়ে জলাশয়ের অপর প্রান্ত থেকে গুলি ছুঁড়তে থাকে। গুলির শব্দে পাকবাহিনী বর্ণি ক্যাম্প হতে আবার গুলি বর্ষণ করতে থাকে। এখন আমাদের দুদিকে গুলাগুলি। মাঝখানে জলাশয়ের মধ্যে ডুবে আছি আর আল্লাহকে ডাকছি। ভোর পর্যন্ত চলে উভয় পক্ষের গুলাগুলি। এক পর্যায়ে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা ভোরের দিকে ক্যাম্পে ফিরে আসে। অতএব পাকিবাহিনীও গুলি বন্ধ করে। পরিস্থিতি শান্ত হলে অত্যন্ত সন্তর্পণে আধমরা অবস্থায় আমরা কয়েকজন জলাশয় হতে কোনোরকম ক্যাম্পে এসে পৌঁছাই। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় যে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা সংঘটিত  হয়েছে তা অত্যন্ত অমানবিক, জঘন্য ও বর্বরোচিত আচরণ।

পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সহযোগী দেশীয় শক্তিসমূহ- রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর নির্মমতা একটি অমানবিক ও পৃথিবীর জঘন্যতম অপরাধ।

আমার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের কিছু স্মৃতি মেহেরপুরের মুজিবনগর ‘ওয়ার মিউজিয়াম’ এবং ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ‘বিজয় কেতনে’ সংরক্ষিত আছে।