এক গাঁয়ে বাস করত এক দম্পতি। তাদের অনেকগুলো ছেলেমেয়ে। এই দম্পতির আয়-রোজগার খুবই অল্প। মাছ ধরা, তাঁত বোনা, জীবজন্তু শিকার করা তাদের পেশা।
লোকটি একদিন গেছে মাছ ধরতে। ফাঁদ পেতে জীবজন্তু শিকারও করা হবে। নদীতে জাল পাতা হলো। বনের ভিতরে পাতা হলো জীবজন্তু আটকানোর ফাঁদ। আজ অদ্ভুত ঘটনা একটা ঘটে গেল। বাড়ি ফিরতে গিয়ে রাস্তায় টাকা ভর্তি একটা বস্তা পেয়ে গেল লোকটা। বড়সড় একটা রুই মাছ ধরা পড়েছে জালে। বনের ফাঁদে আটকা পড়েছে একটা হরিণ।
লোকটা হতভম্ব। অবাক হলেও মাথা ঠান্ডা রাখতে হয় তাকে। বেশ কিছুক্ষণ ভেবে লোকটা কৌশল ঠিক করে ফেলল। রুই মাছ ও হরিণটাকে মেরে ফেলল প্রথমে। তারপর রুই মাছটা রাখল ডাঙায় পাতা ফাঁদে। হরিণটা রাখা হলো নদীর পানিতে পাতা ফাঁদে। ঘন ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে রাখল টাকার বস্তা।
লোকটি ভালো করেই জানে যে, তার বউ বড্ডো মুখপাতলা মানুষ। কোনো গোপন কথাই সে নিজের মধ্যে রাখতে পারে না। কাউকে না কাউকে বলা চাই-ই চাই।
বাড়ি ফিরে হাঁক দেয় লোকটা, কই গো, এদিকে এসো শিগগির। আমার সঙ্গে চলো। অদ্ভুত সব কাণ্ড ঘটেছে আজ। নিজের চোখে না দেখলে তুমি বিশ্বাসই করতে পারবে না।
বউ তড়িঘড়ি স্বামীর সঙ্গে রওনা হয়। বনে গিয়ে তার চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। এ কী কাণ্ড! বনে পাতা ফাঁদে একটা রুই মাছ। নদীর ফাঁদে হরিণ ধরা পড়েছে। গভীর বনে পাওয়া গেল এক বস্তা টাকা। অদ্ভুত সব ঘটনা।
সব দেখেশুনে বউ মহাখুশি। ভাবল, যাক এতদিনে কপাল ফিরল। এখন থেকে তারা আর গরিব নয়।
পরের দিনই সে পড়শিদের সঙ্গে এই বিষয়ে গল্প করতে গিয়ে অকপটে বলে দিল সব কথা। এক কান, দুই কান—এভাবে কথা ছড়িয়ে গেল দেশময়। টাকার বস্তা পেয়ে রাতারাতি ধনী হয়ে গেছে হাভাতে এই পরিবারটি। রসালো গল্প আরো ফুলেফেঁপে শেষতক অবিশ্বাস্য এক কাহিনিতে রূপান্তরিত হলো।
লোকটি যে এক বস্তা টাকা পেয়েছে, এই খবর আর গোপন নেই। খবর পৌঁছে গেছে এলাকার মেয়রের কানেও। মেয়র লোকটাকে তলব করলেন। এইসঙ্গে তার বউকেও ডাকা হলো। কৌতূহলী মেয়র জানতে চান, কী হে? তুমি নাকি দশ বস্তা টাকা পেয়েছ? যা যা ঘটেছে, সাফ সাফ বলো। সত্য গোপন কোরো না। কোথায় সেই টাকা?
বিশ্বাস করুন মাননীয় মেয়র। আমি কোনো টাকা পাইনি। সবই গুজব। মানুষজন বানিয়ে বানিয়ে বলছে।
বললেই হলো? এলাকার লোকজন নিত্যদিন এই কথা বলাবলি করছে। তুমি দেখি উলটা কথা বলছ! মিথ্যে বললে ঝামেলায় পড়বে।
মাননীয় মেয়র। আপনি যা যা শুনেছেন, তা সত্য নয়।
মেয়র এসব কথায় টলেন না। হুঙ্কার দিয়ে বলেন লোকটাকে, তোমার বউই তো এসব কথা বলে বেড়িয়েছে। সক্কলেই জানে সে কথা।
আমার বউয়ের কথা ধরবেন না। ও সব সময়ই আবোল তাবোল বলে। ওর উলটাপালটা কথা সব কি আপনি বিশ্বাস করবেন? ওকে জিগ্যেস করে দেখুন না।
মেয়র লোকটার বৌয়ের কাছে জানতে চান, আচ্ছা বেশ। তুমি বলো কী কী ঘটেছে। কেমন করেই বা ঘটেছে?
বউটি হড়বড় করে বলতে থাকে, আমার স্বামী নদীতে জাল পেতেছিল। সেই জালে একটা নাদুস নুদুস হরিণ আটকা পড়ে। আমি নিজের চোখে সেটা দেখেছি।
আর, আর কী হলো? বনে যে ফাঁদ পাতা হয়েছিল, সেখানে কী দেখলে তুমি? সত্যি কথা বলবে।
বৌ অনর্গল বলে যেতে থাকে, আরো একটা মজার কাণ্ড হয়েছে। ডাঙায় পাতা ফাঁদে আটকা পড়েছিল বড় সাইজের একটা রুই মাছ।
কী বললে তুমি? যত্তসব আবোল তাবোল বকছ। যা বলছ, তার সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল আছে? তোমার মাথার সব নাট বল্টু নিশ্চয়ই ঢিলা হয়ে গেছে।
বউটি আরো কিছু বলতে যায়। মেয়র তাকে তক্ষুনি থামিয়ে দেন। বিরক্ত ও রাগী গলায় বলেন, যাও ভাগো। তোমার গাঁজাখুরি গল্প শুনে নষ্ট করার মতো সময় আমার নেই।
নেদারল্যান্ডসের লোকগল্প অবলম্বনে