চট্টগ্রাম অফিস
দুদক ও চট্টগ্রাম মহানগরী দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির উদ্যোগে গত সোমবার চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির ৬৯টি অভিযোগ পেয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার এ এফ এম আমিনুল ইসলাম। মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের উপস্থিতিতে সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মহানগরীর ভুক্তভোগী জনসাধারণ এসব অভিযোগ তুলে ধরেন।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের (চমেক) শাহ আলম বীর উত্তম মিলনায়তনে এই শুনানির আয়োজন করা হয়। শুনানি উপলক্ষে অভিযোগ জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ব্যানার টানানো হয়েছিল। গত ১ অক্টোবর থেকে নগরীতে লিফলেট বিতরণসহ চালানো হয়েছিল প্রচারণা। সকাল ১০টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত এই শুনানি হয়েছে।
শুনানিতে লালখান বাজার ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এ এফ কবির আহমেদ মানিকের বিরুদ্ধে জায়গা দখলের অভিযোগ করেন সালামত মিয়া নামের এক ওয়ার্ড বাসিন্দা। কাউন্সিলর মানিকের বিরুদ্ধে মসজিদের জায়গায় জোর করে দোকান নির্মাণ করে ভাড়া বাবদ ৭০ লাখ টাকা আদায় এবং এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের অনুমতি দিয়ে দৈনিক ১০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ আনা হয়। এছাড়া সালামত আরো অভিযোগ করেন, কাউন্সিলর মানিক রেলওয়ের পাহাড়ি জমি দখল করেছেন আর উন্নয়নকাজের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত্ করেছেন।
শুনানিতে উপস্থিত কাউন্সিলর মানিক এসব অভিযোগ অস্বীকার করলেও দুদক কমিশনার চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসককে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে চসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সুদীপ বসাকের বিরুদ্ধে।
চসিকের অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী শামসুল হুদা সিদ্দিকী অভিযোগ করেন, ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে ট্রলি সংস্কার দেখিয়ে মেসার্স মাসুম এন্টারপ্রাইজের নামে ভুয়া বিল তৈরি করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত্ করেছেন তত্ত্বাবধায়ক সুদীপ বসাক। তিনি আরো অভিযোগ করেন, সাগরিকায় একটি নতুন ও একটি পুরোনো অ্যাসফল্ট প্ল্যান্ট আছে। পুরোনো প্ল্যান্টটিতে ৬৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন। এরপরও সুদীপ বসাক ১২৯ জন লোক নিয়োগ দিয়েছেন, যাদের অধিকাংশই তার আত্মীয়-স্বজন। এছাড়া সাগরিকায় করপোরেশনের পাথর ডিপোতে পাথর সংরক্ষণ ও বিতরণের হিসাবে গরমিল দেখিয়ে সুদীপ বসাক ২ কোটি টাকা আত্মসাত্ করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
নাম প্রকাশ না করে লিখিত অভিযোগও জমা পড়ে সুদীপ বসাকের বিরুদ্ধে। এতে বলা হয়, ৫০ টন ধারণ ক্ষমতার দুটি ওয়েব্রিজ স্থাপন ও সরবরাহের কাজ দিয়েছেন সুদীপ তার এক চাচাতো ভাইকে। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে সুদীপ বসাককে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তার তিন সহকর্মী। তবে শুনানিতে উপস্থিত সুদীপ বসাক এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নিয়ম মেনে কাজ হয়েছে বলে দাবি করেন। তবে দুদক কমিশনার করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে তদন্ত করে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
চসিকের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের বিরুদ্ধেও ভুক্তভোগীরা বিভিন্ন অভিযোগ তুলেন। এর মধ্যে আছে, করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা শফিকুল মান্নান সিদ্দিকীর জাল সনদের মাধ্যমে এক শ্রমিককে পরিদর্শক করা। এছাড়া টাকা না দিলে ময়লা না সরানোর অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে।
প্লট বরাদ্দের নামে চসিকের বিরুদ্ধে ৩৩ লাখ টাকা আত্মসাতেরও অভিযোগ আনেন এক ভুক্তভোগী। আবদুল মতিন নামে এক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের লেকসিটি প্রকল্পে প্লট দেওয়ার নামে তার কাছ থেকে ৩৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন করপোরেশনের সার্কেল-৫ এর রাজস্ব কর্মকর্তা জানে আলম। প্লটের জন্য দেওয়া টাকার বিপরীতে তাকে কিছু কাগজপত্রও দেওয়া হয়। কিন্তু পরে যাচাই-বাছাই করে দেখা যায়, এসব কাগজপত্র জাল। এরপর টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বললেও তা দেননি ঐ কর্মকর্তা।
শুনানিতে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জানে আলমকে বরখাস্ত করা হয়েছে ও তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলছে বলে জানানো হয়। দুদক কমিশনার আমিনুল ইসলাম দুই মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করে ভুক্তভোগীর টাকা ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেন।
গৃহকরের টাকা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে চসিকের বিরুদ্ধে। চট্টগ্রাম মহানগরীর চান্দগাঁও এলাকায় জহির আহমদ নামের এক ব্যক্তির পাঁচ তলা ভবনের গৃহকর নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। তিনি অভিযোগ করেন, ২০১৫ সালের ২৭ মে নোটিশ দেওয়া হলে ২৮ জুন করপোরেশনের কর আদায়কারীকে সব টাকা জমা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাকে রশিদ দেওয়া হয় ৫৫ হাজার টাকার। বাকি টাকার কোনো হিসাব তাকে দেওয়া হচ্ছে না। শুনানিতে চসিকের ওয়ার্ডসমূহের কাউন্সিলর ও কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।