ব্রেক্সিট বিভ্রাট :শেষ কোথায়?

ব্রেক্সিট অর্থাত্ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের সদস্যপদ প্রত্যাহার নিয়ে বিভ্রান্তি এখন চরমে। ২০১৬ সালের ২৩ জুন এক গণভোটে ৫১.৯ শতাংশ ভোটে ব্রিটেনের জনগণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার পক্ষে ভোট দেন। ভোটের ফলাফল দেখে স্পষ্ট অনুমান করা যায় যে, পক্ষে এবং বিপক্ষে প্রায় সমান সমান জনমত রয়েছে। একদিকে ব্রিটিশ জনগণের ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের স্বপ্ন’ অপরদিকে বিশ্বব্যাপী সহযোগিতার নতুন দিগন্ত- কোনটি বেছে নেবে ব্রিটিশ জনগণ? স্বাভাবিকভাবে ব্রিটিশ জনগণকে রক্ষণশীল মনে করা হয়। এক সময়ে ব্রিটিশ রাজত্বে সূর্য অস্ত যেত না। পূর্ব-পশ্চিম উত্তর-দক্ষিণ সর্বত্রই ছিল তাদের একক প্রাধান্য। মর্যাদায় মহিয়ান ছিলেন তারা। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তাদের অনেকটা কাবু করে ফেলে। কর্তৃত্বের সীমানায় প্রতিষ্ঠিত হয় তাদেরই জাতভাই- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠিত হলে প্রাথমিকভাবে ব্রিটেন সম্মিলিত শক্তি থেকে কিছুটা সময় বিচ্ছিন্ন থাকে। ১৯৭৩ সালে তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদান করেন। ১৯৭৫ সালে গৃহীত গণভোটে যথারীতি যোগদান অনুমোদিত হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের পর ব্রিটেন কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশ সুবিধে ভোগ করলেও, অভিবাসীদের চাপ অনুভব করে। বিশ্ববাণিজ্য ও মানবাধিকারের মত বিষয়ে ব্রিটেনের একক কর্তৃত্ব খর্ব হয়। জনগণের একটি বিপুল অংশ মনে করেন ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদান করে তাদের তেমন কোনো লাভ হয়নি। সুতরাং ব্রিটেনের বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। দাবি ও আন্দোলন এতটাই বেগবান হয় যে, সরকার গণভোটের আয়োজন করতে বাধ্য হয়। এদিকে ব্রেক্সিট প্রশ্নে ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল দলে বিভক্তি দেখা দেয়। ব্রেক্সিট বিরোধী ডেভিড ক্যামেরন সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারান। থেরেসা মে ব্রেক্সিট পক্ষের নতুন সরকার গঠন করেন।

ইউরোপের সম্মিলিত সহযোগিতা থেকে ব্রিটেনের প্রস্থান নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনের ঐ পদক্ষেপের সমালোচনা করে। ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহ বিশেষ করে জার্মানি ও ফ্রান্স ব্রিটেনের তীব্র সমালোচনা করে। তারা মূল ইউরোপের অধিকতর ঐক্যের আহ্বান জানান। অপরদিকে ব্রিটেনের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বৈদেশিক সম্পর্ক ব্রেক্সিটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্রিটেনকে বেরিয়ে যাওয়ার মাশুল হিসেবে অনেক কঠিন কঠিন শর্ত আরোপ করে। নতুন প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে সহজে জট খুলতে ব্যর্থ হন। আলোচনা দীর্ঘায়িত হয়। ব্রিটেনের জনগণ ক্রমশ বুঝতে পারেন যে, ব্রেক্সিটের ফলে তারা একটি জটিল অবস্থার সম্মুখীন হয়েছেন। তারা দ্রুত এর সমাধান আশা করেন। কিন্তু তুরুপের তাস ইউরোপীয় ইউনিয়নের হাতে থাকায় এ অবস্থায় থেরেসা মে এর সরকার বিভক্তি ও অস্থিতিশীলতার সম্মুখীন হয়। বেশ কয়েকজন মন্ত্রী পদত্যাগ করেন। অনেকেই থেরেসা মে এর পতন আসন্ন মনে করছিলেন। তিনি কোনোমতে টিকে গেলেও ব্রেক্সিটের বিপক্ষে জনমত বৃদ্ধি পেতে থাকে। কয়েকটি শহরে ব্রেক্সিটের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হতে দেখা যায়। ক্রমবর্ধমান জনমতের চাপে ১০ ডিসেম্বর ব্রিটিশ পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিতব্য ভোটাভুটি স্থগিত করা হয়। পরিবর্তনশীল জনমতের চাপে মন্ত্রীরা থেরেসা মে কে ভোট গ্রহণ পিছিয়ে নিতে অনুরোধ করেছিলেন। আগামী সপ্তাহে কিংবা আগামী মাসে এই ভোট হতে পারে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন হাউস অব কমন্সে ভোট হলে এই মুহূর্তে থেরেসা মে জয় পাবেন না। তাই তিনি আপাতত ভোট স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছেন। তথ্যাভিজ্ঞ মহল দাবি করেন যে ভোট হলে থেরেসা মে অন্তত একশ’ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হতেন।

সর্বশেষ খবরে জানা গেছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে তার ব্রেক্সিট চুক্তি বাঁচাতে ইউরোপীয় নেতা ও ইইউ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরু করেছেন। ব্রেক্সিট চুক্তি নিয়ে পার্লামেন্টে ভোট পিছিয়ে দেওয়ার পর ডাচ প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুটে ও জার্মানির চ্যান্সেলর এ্যাঞ্জেলা মার্কেলের সঙ্গে আলোচনা করছেন। উত্তর আয়ারল্যান্ড সীমান্ত পরিকল্পনা নিয়ে ইইউ-এর সাথে আরো কিছু বোঝাপড়া তার দরকার। সে কারণে সময় প্রয়োজন। ব্রিটেন যাতে উত্তর আয়ারল্যান্ড পরিকল্পনার ফাঁদে দীর্ঘদিন আটকা পড়ে না থাকে সে ব্যাপারে আইনি নিশ্চয়তা চাচ্ছেন থেরেসা মে। এ পরিকল্পনায় ব্রিটেনের উত্তর আয়ারল্যান্ড এবং ইইউ সদস্য আয়ারল্যান্ডের মধ্যে একটি অবাধ সীমান্ত নিশ্চিত করতে সাময়িকভাবে একটি কাস্টমস ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। কিন্তু ব্রিটিশ আইন প্রণেতাদের আশঙ্কা অনির্দিষ্টকাল এ ব্যবস্থায় আটকে যেতে পারেন তারা। এর ফলে ব্রিটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরও উত্তর আয়ারল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ডের মধ্যে অবাধ পণ্য প্রবাহের নিশ্চয়তা থেকে যাবে। তাছাড়া ব্রেক্সিট চুক্তির শর্তানুযায়ী ব্রিটেন ইইউ-এর সম্মতি ছাড়া ঐ ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না বলে কূটনীতিকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। তবে ইউরোপীয় কোর্ট অব জাস্টিস বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭ সদস্য রাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়াই ব্রেক্সিট বাতিল করতে পারে ব্রিটেন। তারা চাইলে ব্রেক্সিটের সিদ্ধান্ত বাতিল করে ইইউ-এর সাথে থেকে যেতে পারবেন। এজন্য ইইউ-এর আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রয়োজন হবে না। এতে ব্রিটেনের সদস্য পদের শর্তাবলির কোনো পরিবর্তন হবে না। আইনের এই ব্যাখ্যার পর ব্রিটেনে বিচ্ছেদ বিরোধীদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা।

উল্লেখ্য যে, ব্রিটেনের ব্রেক্সিট বিরোধী একদল রাজনীতিক ইইউ-এর শীর্ষ আদালতে জানতে চেয়েছিলেন তারা ব্রেক্সিট সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারবে কিনা? তবে ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রধান আইনজীবী হিউবার্ড এই যুক্তি দেন যে, সদস্য দেশগুলোর মতামত ছাড়াই ব্রেক্সিট বাতিলের পক্ষে রায়, খারাপ নজির সৃষ্টি করবে। এর ফলে সদস্য দেশগুলো বাড়তি সুবিধা আদায়ে বিচ্ছেদের ঘোষণা দিয়ে আবার তা বাতিলের কৌশল নিবে। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে ব্রেক্সিট সিদ্ধান্ত বাতিলের কোনো ইচ্ছে ব্রিটেনের নেই। সুতরাং ইউরোপীয় আদালতের উচিত এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা। সরকারের উপর চাপ বাড়ানোর রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে মতামত চাওয়া হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। রায়ের বিস্তারিত বিবরণে বলা হয়, বিচ্ছেদের আনুষ্ঠানিক আবেদন বা বিধি ৫০ সক্রিয় করার দুই বছরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশ পূর্ব সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারে। এক্ষেত্রে অন্য সদস্য দেশগুলোর মতামত প্রয়োজন হবে না। তবে গণতান্ত্রিক পন্থায় সংসদের অনুমোদন নিয়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন অধিকতর যুক্তিসঙ্গত।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী  থেরেসা মে’র ঘরে-বাইরের তত্পরতা দেখে স্পষ্ট হচ্ছে যে, তিনি এখনো বিচ্ছেদের পথেই অবিচল রয়েছেন। ব্রিটিশ সরকারের পরিবেশমন্ত্রী মাইকেল গোভ বলেছেন, রায়ের সবটুকু ভালো। কিন্তু বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার কোনো আগ্রহ সরকারের নেই। ২০১৯ সালের ২৯ মার্চ বিচ্ছেদ কার্যকর করার জন্যই সরকার কাজ করছে আর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট বলেছেন, ব্রেক্সিটের কোনো বিলম্ব হলে জনগণ অত্যন্ত বিরক্ত হবে। সরকার বিচ্ছেদের বিকল্প কিছু ভাবছে না। স্মরণ করা যেতে পারে যে, দীর্ঘ ১৮ মাসের চেষ্টার পর  সম্প্রতি ব্রেক্সিট বিষয়ে একটি চুক্তিতে উপনীত হয় ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। আগেই বলা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে হাউজ অব কমন্সের ভোটাভুটি স্থগিত করা হয়েছে। ব্রিটেনের বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি সরকারি দলের অনেক এমপি এই চুক্তিকে দেশের স্বার্থ বিরোধী আখ্যা দিয়ে তুমুল বিভ্রাটের সৃষ্টি করেছেন। থেরেসা মে এর সরকার অস্থিতিশীলতার মধ্যদিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, চুক্তি প্রত্যাখ্যান করা হলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ব্রেক্সিটই- নাও হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

গণতন্ত্রের পীঠস্থান হিসেবে ব্রিটেনের সুনাম আছে। এটা লক্ষণীয় যে, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলো নির্ভেজাল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উপর নির্ভর করছে। তবে সর্বসাধারণের মতামত যে সবসময় সঠিক হবে- এমনটি নাও হতে পারে। সাধারণ মানুষেরা আবেগ উত্তেজনা তথা সেন্টিমেন্ট দ্বারা বিভ্রান্ত হয়। ব্রিটেনের অধিকাংশ জনসাধারণ রাজনৈতিকভাবে সচেতন হওয়া সত্ত্বেও দেখা গেল যে, ব্রেক্সিট নিয়ে বিতর্কের শেষ হয়নি। মনীষী এস. ই. ফাইনার বলেন, ‘পাবলিক ওপেনিয়ন ইজ নাইদার পাবলিক নর ওপেনিয়ন।’ জনমত জনও নয়, মতও নয়। সুতরাং ব্রিটিশ জনগণ যদি তাদের সদিচ্ছা ব্যক্ত করে আরেকবার ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রত্যাবর্তন করেন, তবে তাতে বিস্ময়ের কিছুই থাকবে না। গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিএমজি রিসার্চের সাম্প্রতিক প্রকাশিত একটি জরিপ হতে জানা যায় যে, বর্তমানে ব্রিটেনের বায়ান্ন ভাগ মানুষ ব্রেক্সিটের বিপক্ষে অবস্থান করছেন। একটি পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে যে, গত গ্রীষ্মকাল হতে ব্রেক্সিটের বিপক্ষে জন সমর্থন ৪০ শতাংশ থেকে বেড়ে চলতি মাসে ঐ ৫২ ভাগে উপনীত হয়েছে। পূর্বেকার সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্রেক্সিট বিরোধী জনমত ৪০ শতাংশে ঠেকেছে। ঐ পরিসংখ্যানে আরো বলা হয় যে, মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষ থেরেসা মে এর প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থাশীল রয়েছে। তবে এতোদূর অগ্রসর হবার পর ব্রেক্সিট থেকে ফিরে আসাও ব্রিটেনের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এই ব্রেক্সিট বিভ্রাটের ৩টি সমাধান আছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। প্রথমত. ব্রিটেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রদত্ত শর্তাবলি মেনে নিয়েই বিচ্ছিন্ন হতে হবে। দ্বিতীয়ত.থেরেসা মে সরকারকে নতুন করে গণভোটের আয়োজন করতে হবে। তৃতীয়ত. স্বাভাবিকভাবেই ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া বন্ধ করে পুনরায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে ব্রিটেন। উভয়পক্ষের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে অন্য কোনো চুক্তি বা সমঝোতা দ্বারা ব্রেক্সিট বিভ্রান্তি দূর হতে পারে। সম্ভবত আগামী তিন মাসের মধ্যেই একটি সমাধান লক্ষণীয় হয়ে উঠবে।

n লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়