জামালদের হাসি সুনীলদের মুখে

যুব ভারতী ক্রীড়াঙ্গনের মাঠে ইতিহাস গড়া হলো না বাংলাদেশের ফুটবলারদের। ৩৪ বছর আগে বড়োরা যা পারেনি, তা করে দেখানোর সুযোগ পেয়েও হাতছাড়া করে ফেলল উত্তরসূরিরা। ভারতের বিপক্ষে জিততে জিততে শেষ পর্যন্ত ড্র নিয়েই মাঠ ছাড়ল বাংলাদেশ।

কাতার বিশ্বকাপ বাছাই ম্যাচটিতে বাংলাদেশ কি দারুণ ফুটবলই না খেলেছে। হূদয় নিংড়ানো ফুটবল খেলেছে। মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতোই খেলেছে। সল্ট লেকের মাঠে সাদ উদ্দিনের গোল বাংলাদেশকে (১-০) এগিয়ে দিলেও শেষ পর্যন্ত জয়ের বন্দরে তরি ভেড়াতে পারেনি বাংলাদেশ। ৮৮ মিনিট পর্যন্ত এগিয়ে থেকেও জয় পায়নি বাংলাদেশ। শেষ দুই মিনিট বাকি থাকতে বাংলাদেশের জালে বল জড়িয়ে আদিল ভারতকে পরাজয়ের হাত থেকে রক্ষা করেছেন (১-১)। যদিও বাংলাদেশ অন্তত চারবার গোলের সুযোগ পেয়েছিল।

ভারতের ১২০ কোটি মানুষ। বাংলাদেশের ১৮ কোটি। ফিফার র্যাংকিংয়ে ভারত ৮৩ ধাপ ওপরে। ভারতের মতো এত বড়ো এবং শক্তিশালী ফুটবল দলকে তাদের মাঠে হারানো চাট্টিখানি কথা নয়। সুযোগ পেয়েও হয়নি। দুই মিনিটের আক্ষেপে চোখের জলে ভিজেছে জামাল ভুঁইয়ারা। বাংলাদেশের খেলা দেখে প্রশংসা করেছেন ভারতীয় ক্রোয়েশিয়ান কোচ ইগর স্তিমাচ। তার চোখে গোলকিপার রানা সেরা খেলোয়াড়। হাড্ডাহাড্ডি ম্যাচ। বাংলাদেশের বল ভারতের ক্রসপিসে লেগেছে। গোল লাইন থেকে ফিরেছে। ভারতেরও একটা বল গোল লাইন থেকে ফিরেছে। হারতে বসা ম্যাচে এক পয়েন্ট পেয়ে দারুণ খুশি ভারত।   

প্রায় ৬০ হাজার দর্শক সল্ট লেকের মাঠে। যুব ভারতী ক্রীড়াঙ্গন তখনো কাঁপছে। এত দর্শক গত আট বছরে হয়নি সেখানে। চেয়ারগুলো ময়লা হয়ে গিয়েছিল; কোনো রকমে ঝাড়পোঁছ করে প্রস্তুত করা হলেও দর্শক বসে পরিষ্কার করে ফেলেছিল। ধরে নিয়েছিল খেলাটা শুরু হলেই গোলের বৃষ্টি ঝরাবে ভারত। খেলা শুরু হওয়ার আগেই কলকাতার দর্শকরা ধরেই নিয়েছিল এই ম্যাচে নিশ্চিতভাবেই জিতবে ভারত। গোলের ব্যবধান কতটা হয় সেটাই ছিল তাদের দেখার। সিরিয়ার রেফারি মাসুদের বাঁশি বাজতেই আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভারত। সুনীলরা বল পায়ে দুরন্তগতিতে যখন ছুটছিলেন কলকাতার আকাশ তখন কাঁপছে দর্শকের চিত্কারে। বাংলাদেশের ৪-২-৪ ফরমেশনের বিপক্ষে ভারতের ৪-৪-২ ফরমেশন। কাউন্টার আক্রমণে বাংলাদেশ প্রথম কর্নারটা পেয়ে কাজে লাগাতে পারেনি। ভারতের উইংব্যাক আনাসের একটা ছোটো ভুলের সুযোগে বল পেয়েছিলেন বিপলু। বল নিয়ে ভারতের বক্সে ঢুকে নিচু ক্রস ফেলেছিলেন। স্ট্রাইকার জীবন বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে পারেননি। তার আগেই ভারতীয় ডিফেন্ডার ক্লিয়ার করেন। সেই সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার আফসোস পোড়াবে বাংলাদেশের ফুটবল অনুরাগীদের। ভারত আক্রমণভাগে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। গোলকিপার আশরাফুল রানা পুরো সময়টাই প্রস্তুত ছিলেন। সুনীলের চেষ্টা দারুণভাবে প্রতিহত করেন রানা। সুনীলের হেডও ঠেকিয়ে দেন গোলপিকার রানা। ৪২ মিনিটে বাংলাদেশ ভারতের জাল কাঁপিয়ে দেয়। সেটপিসে শট করেন বাংলাদেশের অধিনায়ক জামাল। বলটা উড়ে গিয়ে পড়ে কোনায়। সাদ অসাধারণ শরীরি ভঙ্গিতে বলটা ভারতের জালে জড়িয়ে ৬০ হাজার দর্শকের বুকে পেরেক গেঁথে দেন; ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। জামাল ভুঁইয়া দৌড়ে গিয়ে ভারতীয় দর্শকদের সামনে উল্লাস করলেন। গোলদাতা সাদও যোগ দিলেন তার সঙ্গে। উত্সবে যোগ দিলেন অন্যরা। ভারতীয় দর্শকরা তখন নীরব। বাংলাদেশ যেন ক্ষণেক্ষণে আক্রমণ শান দিচ্ছিল। মাথার ওপরে ৬০ হাজার দর্শকের দিকে না তাকিয়ে লড়াই করছিল বাংলাদেশ। মরিয়া ভারত গোল শোধ করার জন্য সুনীল, অনিরুদ্ধ, মানভির সিং, আদিল, সামাদ, উদায়ন্তরা মরিয়া হয়ে ওঠেন।

বাংলাাদেশের ভাগ্য খারাপ বলতেই হয়। স্ট্রাইকার জীবন ভারতের গোলকিপার গুরপ্রীতকে একা পেয়েও গোল করতে পারেনি। এরপর ইব্রাহিমের শট ভারতের ক্রস পিসে লেগে ফিরে আসে।  ভারতের নিশ্চিত গোল লাইন থেকে ফিরিয়ে দেন রিয়াদুল। ভারত কাউন্টার আক্রমণে আবারও সুযোগ পেলেও সে যাত্রাও বেঁচে যায় বাংলাদেশ। দুর্ভাগ্য বাংলাদেশের জীবনের শট ভারতীয় গোলকিপার গুরপ্রীতের মাথার ওপর দিয়ে গেলেও ডিগবাজি নিয়ে গোল লাইন হতে ফিরিয়ে আনেন ডিফেন্ডার আদিল। এই আদিলই শেষ পর্যন্ত গোল শোধ করে ভারতের নিশ্চিত হার ঠেকিয়েছেন। কর্নার থেকে পাওয়া বলে আদিল হেড করে বাংলাদেশের স্বপ্ন শেষ করে দেন। ম্যাচ বাঁচিয়ে সেরা খেলোয়াড়ও হয়েছেন ভারতের আদিল।

বাংলাদেশ :আশরাফুল রানা, রায়হান, রহমত মিয়া, ইয়াসিন খান, রিয়াদুল হাসান, বিপলু আহমেদ, জামাল ভুঁইয়া (অধিনায়ক), সোহেল রানা, নাবীব নেওয়াজ জীবন (সুফিল), ইব্রাহিম (রবিউল), সাদ উদ্দিন।