বন্ড সুবিধা নিঃসন্দেহে সরকারের একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। ব্যবসায়ীদের এই সুবিধা দেওয়া হইয়াছে দেশের রপ্তানিমুখী বিকাশমান কয়েকটি খাতকে চাঙ্গা করিবার জন্য। এই সুবিধায় শিল্পের কাঁচাপণ্য আমদানি করিয়া শতভাগ ফের রপ্তানি করিবার শর্ত রহিয়াছে। বিশেষ করিয়া স্পিনিং তথা টেক্সটাইলের কথা উল্লেখ করিতে হয়। এক শ্রেণির ব্যবসায়ী বন্ড সুবিধার এতটাই অপব্যবহার করিয়া চলিয়াছেন যে, সরকারের শুল্ক বিভাগ, শুল্ক গোয়েন্দাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অভিযানে নামিতে হইয়াছে; কিন্তু দির্ঘদিন ধরিয়া অসাধু চক্রের অপতত্পরতায় অদ্যাবধি বিপাকে পড়িয়া আছেন নিয়ম মানিয়া সুতা আমদানিকারকরা। তাহারা শুল্কসুবিধা লইয়া খোলাবাজারে বিক্রয়কারী অসত্ চক্রের সহিত অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়িয়াছেন। ইহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, যাহারা আমদানিকৃত সুতা শুল্কমুক্ত সুবিধা লইয়া খোলাবাজারে বিক্রয় করিতেছেন তাহাদের সহিত রহিয়াছে শুল্ক বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ। ইহা এখন সর্বজনবিদিত যে, অসাধু চক্রের আমদানিকৃত সুতা বন্ডেড হাউজে না গিয়া সরাসরি খোলা বাজারে চলিয়া যাইতেছে। অধিকন্তু রহিয়াছে ইনভয়েসিংয়ের ক্ষেত্রে কারসাজি।
আমাদের স্পিনিং মিলগুলি ভালোই আগাইতেছিল। এই আগাইবার কারণেই সুতা আমদানির প্রয়োজন পড়িয়াছে এবং প্রয়োজন রহিয়াছে। আর সেই প্রয়োজন মিটাইতেই টেক্সটাইল ও স্পিনিং ব্যবসায় অনেকে আগাইয়া আসিয়াছেন; কিন্তু এইভাবে বিদেশ হইতে সুতা আনা এবং অপব্যবহারের ফলে টেক্সটাইল শিল্পে এখন দেখা দিয়াছে মারাত্মক খরা। তাহার উপর রহিয়াছে বিদ্যুত্ ও গ্যাসের সংকট, ইহা অস্বীকার করা যাইবে না। যদিও গ্যাস ও বিদ্যুতের অবস্থা খানিকটা উন্নত হইয়াছিল; কিন্তু তাহা পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়া যাইতেছে বলিয়া মনে হয়। সুতরাং যাহারা শর্তাবলি অনুসরণ করিয়া সুতা আমদানি করিতেছেন তাহারা রহিয়াছেন চরম উত্কণ্ঠায়।
মনে রাখিতে হইবে, এই শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কেবল স্থানীয়ভাবে গড়িয়া উঠা কারখানার ক্ষতিই করিতেছে না, তাহার সহিত অসত্ উপায়ে অর্জিত কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করিতেছে, যাহার খেসারত গোটা জাতিকে প্রত্যক্ষভাবে দিতে হইতেছে। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এই শ্রেণির বিরুদ্ধে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছে। বিচ্ছিন্ন হইলেও এই পদক্ষেপ আশাব্যঞ্জক। একটি কথা আমাদের সকলের মনে রাখিতে হইবে যে, এই বন্ড জালিয়াতি বন্ধ করিতে না পারিলে দেশের সুতা এবং কাপড় শিল্পে মারাত্মক ধস নামিয়া আসিবে। আরো একটি কথা মনে রাখা দরকার যে, সুতা লইয়া যাহারা প্যাঁচ কষিয়াছেন তাহারা হঠাত্ করিয়া আসেন নাই। দীর্ঘকাল ধরিয়াই তাহারা বাজারে সক্রিয় রহিয়াছেন। তাহাদেরকে বাজার হইতে সরাইতে একটি দুইটি অভিযান বা সাময়িক তত্পরতা যথেষ্ট নহে। প্রয়োজন ব্যাপক ও অব্যাহত অভিযান। কারণ এই অপকর্মে লিপ্তদের এহেন কর্মকাণ্ড সরাসরি জাতির অর্থনীতিকে দুর্বল করিয়া তুলিতেছে।