অমিতাভ রায়
আধাব্যস্ত বিমানবন্দরে একাকী বসে আছি। বিমানবন্দরের ব্যস্ততা অনেকটা ‘নাই কাজের জন্য ছোটাছুটি’—ব্যস্ত পদক্ষেপে দ্রুতমান সবাই, তবে কেন সেই ব্যস্ততা, তা অন্যের পক্ষে বোঝা মুশকিল। ব্যস্ততার আবর্তে সবাই একাকী। আমিও সেই একাকী প্রবাহে অপেক্ষায় ছিলাম বিমান ছাড়ার মুহূর্তের, তখন বাবার ফোন। ‘জয়, শরীরটা খুব খারাপ।’—ওপার থেকে একটু ক্লান্ত আর সর্দি বসা বাবার কণ্ঠ ভেসে এলো। যদিও বাবার কথায় তখনো অশনিসংকেত শুনিনি, কিন্তু মনটা খারাপ হয়ে গেল। বাবা নিজের শরীর নিয়ে খুব একটা অভিযোগ করতেন না। জিজ্ঞাসা করলে একই উত্তর—‘ভালো আছি।’ বয়সের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল বাবার জীবন উপভোগের ক্ষমতা। প্রকৃতির আনাচে-কানাচে রূপের ছটায় বাবার তরুণ হূদয় উচ্ছ্বলিত হতো নবজাতকের নিত্যনতুন আবিষ্কারের আনন্দে। ছয়তলায় নিজের শয়ন ও পঠনকক্ষের উদার জানালাটার পাশেই ছিল বাবার পুস্তক স্তূপাকৃতি লেখার টেবিল। বৃষ্টির ছটা লেখালেখিতে মগ্ন মনটাকে জানালার বাইরে টেনে নিয়ে গেলে ফোনে পেতাম বাবার আনন্দের ভাগ। কখনো-বা অংশীদার হতাম হেমন্তের কুয়াশায় প্রাতঃভ্রমণে বাবার উচ্ছলতার। ফোন বা দূরালাপনি, কেবল আমাদের আলাপনের মাধ্যমই ছিল না, ছিল একে অন্যের হূদয় আবিষ্কারের ঘটকও বটে। আলাপের সূত্রে প্রাধান্য পেত মানুষের, বিশেষত বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও দুঃখ উত্তরণের উপায়। সামাজিক নিষ্ঠুরতার বহিঃপ্রকাশে—কখনো দারিদ্র্য কখনো অগণতান্ত্রিক লিপ্সায়, কখনো-বা সংখ্যালঘুর অত্যাচারে—মনটা উদ্বেলিত হলেই ফোন করতেন। ফোন করতেন সাহিত্যে বা বিজ্ঞানে শ্লাঘার কিছু নজরে এলে। প্রাতঃভ্রমণের পর বাবার প্রাত্যহিক কাজই ছিল আমাকে ছাড়াও নিজের অন্যান্য বন্ধুর সঙ্গে ফোনে আনন্দ বা দেশের দৈনন্দিক উদ্বিগ্ন ভাগাভাগি করা। ঐ সব প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তি সব সময় যে তাদের প্রাতঃকর্মের পূর্বে দেশের উদ্বিগ্নতা খুব আনন্দে ভাগাভাগি করতেন, তা মনে হয় না। তবে আমার সঙ্গে সময়ের দূরত্ব বারো ঘণ্টা। তাই ফোন বেজে উঠত আমার কর্মবিরতির পর। অপেক্ষায় থাকতাম ফোনে ভালোবাসায় আদৃত গম্ভীর গলায় শোনার জন্য—‘জয় .... ফোন কর।’
এখনো কানে বাজে চারটি শব্দ—জয় শরীরটা খুব খারাপ। বিমান উত্তরণের ঠিক আগের মূহূর্তে আমার মনটা খুব খারাপ। আমাদের দূরত্ব ৭ হাজার মাইলেরও বেশি। জীবিকার টানে দিগ্বিদিক ছিটকে গেলেও মন বাঁধা পড়ে থাকে সেই ঘরের দোরগোড়ায়। আশঙ্কাগুলো তাই ধেয়ে আসে ৭ হাজার গুণ বেশি অসহায়ত্ব নিয়ে। আগামী দিন চারেক আমি থাকব দেশের এবং সম্ভবত ফোন সংযোগের বাইরে। শিগিগর ডাক্তারের কাছে যাওয়ার অনুরোধ করে বললাম, চার দিন পর এসে যোগাযোগ করব। ঐ চার দিনই ছিল পরিচিত জগত্টাকে ওলটপালট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। প্রায়ই ঐ মুহূর্তেগুলো মনে মনে পুনরাভিনয় করি—আমার অনুধাবন ঢাকায় ঐ মুহূর্তের জীবনের সত্যতা থেকে ছিল কত দূরে! ভাষার আবিষ্কার প্রায় ১ লাখ বছর আগে হলেও মনব্যক্তির সম্পূর্ণ উপায় আমরা এখনো খুঁজে পাইনি। এত ঘনিষ্ঠতার পরেও আমি বাবার ঐ একটি বাক্যের গুরুত্ব বুঝতে পারলাম না, বাবাও আমাকে বিব্রত করার লজ্জায় মন খুলে বলতে পারলেন না তার শারীরিক আশঙ্কার কথা! মনের গুপ্ত কথা ব্যক্ত করার সাহস অর্জন করতে করতেই দেখি জীবন চলে যায়। বাবার সঙ্গে তো তা-ও বলতে পারতাম মনের গভীরের দুঃখ, লজ্জা ও সংকোচের কথাগুলো। আমার বৈবাহিক জীবন তখন খুব সংঘাতপূর্ণ। এমতাবস্থায় যা হয়, পরিবারের লোকজন তাদের অপনজনের পক্ষ নিয়ে দম্পতির অন্যজনকে তোলে কাঠগড়ায়। এরকম চর্চায় খানিক সুখ পাওয়া যায় বটে, কিন্তু মনের শাস্তি থেকে যায় অধরাই। বাবার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বললে অন্যের ভুলের সঙ্গে সঙ্গে নিতে হতো নিজের ত্রুটিরও দায়িত্ব। শিখতাম বড়ো হওয়ার ছোটো ছোটো পদক্ষেপ আর জীবনে শান্তি আনার সাহস।
প্রাত্যহিক শান্তি আমাদের বাড়িতে খুব সহজলভ্য ছিল না। ভোর হতো মায়ের আর্তচিত্কারে। উচ্চকণ্ঠের কারণ ভিন্ন থাকলেও সূর্যোদয়ের মতো অমোঘ ছিল তার সময়। পারিবারিক এই লঙ্কাকাণ্ডে বাড়ি যখন শব্দময়, শান্তি বিরাজ করত কেবল একটিমাত্র ঘরে। র্যাকিংন স্ট্রিটের বাড়িতে বাইরের ঘর ঐ নামেই ডাকতাম drawing room বা বসার ঘরকে। আর ধানমন্ডির বাড়িতে বাবার ঘর। মুখে অসম্ভব মনোযোগের ছাপ নিয়ে নিজের জগতে পড়ায় বা লেখায় মগ্ন থাকতেন মানুষটা ঐ ঘরগুলোতে। বাইরের শব্দকম্প যেন কোনো দূর গ্রহের কোলাহল। বাবা ও মায়ের জীবনদর্শন ছিল দুই বিপরীত মেরুর। যতদূর স্মৃতি সচল ভেসে ওঠে দুজনে জীবনের দুই ধারায় হাঁটা। যুবা বয়সে মা ছিলেন সংসারের হাল। বাঘিনির ক্ষিপ্রতায় আগলে রাখতেন সংসারটাকে। বাবা তখন ছিলেন মগ্ন মনের আর জীবনের লক্ষ্য অভিসন্ধানে। সারা জীবনই তিনি ছিলেন জীবনশিক্ষার শিক্ষার্থী আর মা ছিলেন সাংসারিক কর্মবীর। বাবার যেখানে মানসিক কর্মক্ষেত্র ছিল সংসারের বাইরে সারা বাংলাদেশে, মার সেখানে ছিল স্বজন বন্ধু আর পরিবারের ভবিষ্যতে। দুজনকেই জিজ্ঞাসা করেছিলাম তাদের দেখা হবার বা শুরুর দিকের কথা। খুব একটা বলতে চাইতেন না। তবে বোঝা যেন প্রেম গভীর ছিল সেই আদিকালে। জীবনের দীর্ঘতা আর খোলাখুলি আলাপচারিতার অভাব নিয়ে গেছে দুজনকে দুদিকে।
অজয় রায়ের ছেলের লেখা স্বোপার্জিত থেকে কিয়দংশ। আজ অজয় রায়ের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী