অভিজিত্ বিনায়ক ব্যানার্জি, এসথার ডুফলো ও মাইকেল ক্রেমারকে অর্থনীতিতে নোবেল দেওয়ার ক্ষেত্রে যে বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে, সেটি হলো দারিদ্র্য বিমোচনে তাদের পরীক্ষানির্ভর গবেষণা পদ্ধতি। যদিও দারিদ্র্য বিমোচন নিয়ে গত দুই দশকে বিশ্ব জুড়ে গবেষকেরা নানা দৃষ্টিকোণ থেকে কাজ করেছেন।
অভিজিত্ ব্যানার্জি ও এসথার ডুফলো তাদের একটি বইয়ে বলেছেন, দিনে সোয়া এক ডলার বা তারচেয়ে কম আয় করা চরম দরিদ্রদের দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বের করে আনা খুবই কঠিন। অবশ্য তাদের গবেষণায় তারা সেই চেষ্টাই করেছেন, যাতে করে দারিদ্র্যের ফাঁদ থেকে মানুষকে বের করে আনার উপায় বের করা যায়। আর এক্ষেত্রে তারা গবেষণা করেছেন অনেকগুলো দরিদ্র দেশে। ব্র্যাকের চেয়ারপারসন ও অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান বিবিসিকে বলেন, দারিদ্র্য বিমোচনে আগের কাজগুলোর সঙ্গে অভিজিত্, ডুফলো ও ক্রেমারের কাজের পার্থক্য হলো, তারা দর্শন বা তত্ত্বকে গুরুত্ব না দিয়ে প্রায়োগিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জোর দিয়েছেন। আরেক অর্থনীতিবিদ মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, এক কথায় কোন কোন পদক্ষেপে দারিদ্র্য আরো দ্রুত নিরসন করা যায়, সেটিই এবারের নোবেল বিজয়ীরা বের করার চেষ্টা করেছেন। দ্য রয়েল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস বলেছে, নোবেল বিজয়ীদের নতুন নিরীক্ষাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি উন্নয়ন অর্থনীতিতে রূপ নিয়েছে, যা এখন গবেষণার নতুন ক্ষেত্র হিসেবে বিকশিত হচ্ছে।
ব্যানার্জি-ডুফলো-ক্রেমারের কাজের বিশেষত্ব :
ধরুন কোনো এলাকার মানুষ দরিদ্র। স্বাভাবিকভাবে সেখানকার মানুষ তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর বদলে কোথাও কাজে দিয়ে অর্থ পেতে আগ্রহী থাকেন। এই গবেষকেরা বলছেন, এই অভিভাবকদের কিছু অর্থ দিলে হয়তো তারা তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাবেন। কিন্তু তারা এই পরামর্শ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং তারা তাদের গবেষণায় নির্দিষ্ট এলাকা থেকে নমুনা ব্যক্তি বাছাই করে তাদের অর্থ দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন যে সেটি আসলেই কাজ করছে কি না।
অর্থনীতিবিদ মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই গবেষকেরা দেখার চেষ্টা করেছেন যে কোন ধরনের শিক্ষা দরকার এবং কী করলে মানুষ তাদের সন্তানদের শিক্ষা নেওয়ার জন্য পাঠাবে। হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, এবারের নোবে বিলজয়ী তিন অর্থনীতিবিদের কাজের বৈশিষ্ট্য হলো :তারা একটি কর্মসূচির রূপরেখা তৈরি করছেন এবং সেটি ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা বোঝার জন্য গবেষণার পদ্ধতিতে নতুনত্ব এনেছেন। যদিও হোসেন জিল্লুর রহমান ও মুস্তাফিজুর রহমান দুই জনই বলছেন যে নোবেল জয় করলেও উন্নয়ন অর্থনীতির এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়েছে এবং এ নিয়ে প্রশ্ন আছে।
অর্থনীতিবিদ নাজনীন আহমেদ বলছেন, এই গবেষকেরা দারিদ্র্যের বড়ো ক্যানভাস ভাগ করে এক্সপেরিমেন্ট করেছেন। তারা কৃত্রিমভাবে পরিস্থিতি তৈরি করেছেন। মানুষের আচরণ বিশ্লেষণ করেছেন এবং দারিদ্র্যের কারণগুলো ভেঙে এর ভেতরে ঢুকে বিশ্লেষণ করে পলিসি সাজেশন দিয়েছেন—এটাই তাদের বিশেষত্ব।
ব্র্যাকের মডেল নিয়ে কাজ করেছেন অভিজিত্ ও ডুফলো
ব্র্যাকের আলট্রা পুওর গ্র্যাজুয়েশন কর্মসূচির প্রধান রোজিনা হক বলেন, ব্র্যাকের এই মডেল শুরু হয়েছিল ২০০২ সালে, যা পরে ফোর্ড ফাউন্ডেশন অন্য দেশেও এটি সফল হয় কি না, তা দেখার চেষ্টা করে। এসব কার্যক্রমের কার্যকারিতা পরীক্ষার লক্ষ্যে বিশ্বের ছয়টি দেশে এমআইটির গবেষক অভিজিত্, ডুফলো ও তাদের সহযোগীরা গবেষণা করেছেন। ব্র্যাক বলছে, তাদের এই মডেলের ওপর গবেষণা নোবেল বিজয়ীদের দারিদ্র্য বিমোচনবিষয়ক গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।