নতুন মজুরি কাঠামো প্রত্যাখ্যান করে বেতন ভাতা-বৃদ্ধির দাবিতে গতকাল বুধবারও গাজীপুরের বেশ কিছু কারখানায় বিক্ষোভ করেছেন গার্মেন্টস শ্রমিকরা। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা গাজীপুর মহানগরীর সাইনবোর্ড এলাকায় মহাসড়ক অবরোধ করলে পুলিশ সরিয়ে দিতে গেলে শ্রমিক-পুলিশের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে গার্মেন্টস শ্রমিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করেছেন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ওয়াইএম বেলালুর রহমান।
পুলিশ, শ্রমিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সকালে উক্ত দাবিতে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাইনবোর্ড এলাকার ইস্ট ওয়েস্ট, প্রীতি সোয়েটার ও ম্যাট্রিক্স সোয়েটারের শ্রমিকরা প্রথমে গার্মেন্টের ভেতরে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে তারা মিছিল নিয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবরোধ সৃষ্টি করে বিক্ষোভ করতে থাকেন। এক পর্যায়ে শিল্প পুলিশ শ্রমিকদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। শ্রমিকরা রাস্তায় যানবাহন ভাঙচুরের চেষ্টা করলে পুলিশ শ্রমিকদের লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে। বেলা সোয়া ১১টার দিকে শ্রমিকরা মহাসড়ক থেকে সরে গেলে মহাসড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।
এদিকে একই সময় কোনাবাড়ি এলাকায় ইসলাম গ্রুপ, মাল্টিফ্যাব, স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপসহ বেশ কয়েকটি কারখানার শ্রমিক বিক্ষোভ শুরু করেন। উচ্ছৃঙ্খল শ্রমিকরা যমুনা গ্রুপের গার্মেন্টসসহ কয়েকটি কারখানার গেট ভাঙচুর ও জানালায় ইটপাটেকল নিক্ষেপ করেন। দুপুর ১২টার দিক তারা ফুটপাতের দোকানের আসবাবপত্র এনে কোনাবাড়ি এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল সড়ক অবরোধ করে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেন। এতে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় শ্রমিকরা লাঠিসোঠা নিয়ে মহাসড়কে অবস্থান নেন। পরে কোনাবাড়ি থানা ও শিল্প পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এ সময় শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। এ ঘটনায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে প্রায় এক ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল।
এছাড়া কাশিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক কারখানায় বিক্ষোভ দেখা দিলে দুপুরে কারখানার শ্রমিক নেতাদের নিয়ে মহানগর পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে বৈঠকে বসে পুলিশ। পুলিশ কমিশনারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শ্রমিকদের দাবির বিষয়টি সরকারকে জানানোর সিদ্ধান্ত হলে নেতারা আন্দোলন স্থগিত করেন।
এ ব্যাপারে পুলিশ কমিশনার ওয়াই এম বেলালুর রহমান জানান, শ্রমিকদের দাবির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। নির্বাচনের আগে এ বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। তাই আগামী ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত শ্রমিকদের আন্দোলন স্থগিত করে কাজে ফিরে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকরা সিদ্ধান্ত মেনে আজ বৃহস্পতিবার থেকে কাজে যোগদানের ঘোষণা দিয়েছে।
আমাদের স্টাফ রিপোর্টার জানান, সাভারের আশুলিয়ার জিরাবো ও কাঠগড়া এলাকায় গতকালও প্রায় ২০টি পোশাক কারখানা সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ও শ্রমিক বিক্ষোভ এড়াতে কারখানা মালিকরা এ ছুটি ঘোষণা করেন। তবে শিল্পাঞ্চলটির বেশির ভাগ কারখানাতেই উত্পাদন চলে স্বাভাবিকভাবে। আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১ এর পরিদর্শক মাহবুবুর রহমান বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ শান্ত রয়েছে। শিল্প এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
এদিকে সম্প্রতি ঘোষিত গার্মেন্টস খাতের জন্য ন্যূনতম মজুরি ও বিভিন্ন গ্রেডের হার নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরে গত কয়েকদিন ধরে শ্রম অসন্তোষ চলছে। গতকালও প্রায় ৪০টি গার্মেন্টসে শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করেছে বলে বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। সংগঠনটি মনে করছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি স্বার্থান্বেষী মহল শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে গার্মেন্টস খাতকে অশান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন বিজিএমইএ’র সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান। গতকাল বুধবার বিদ্যমান শ্রম পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, নতুন মজুরি পাওয়ার আগে আন্দোলন করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। ২০১৩ সালের মজুরির গেজেটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০১৮ সালের মজুরি গেজেট করা হয়েছে। বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নেই। আগামী মাসে মজুরি পাওয়ার পর কোনো বক্তব্য থাকলে কারখানা মালিক, বিজিএমইএ কিংবা সরকারের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানান তিনি।