ল্যাপটপের ব্যাটারির যত্নে

মাহবুব শরীফ

 

ল্যাপটপের অন্যতম সুবিধার ফিচার হচ্ছে এর ব্যাটারি ব্যাকআপ। একবার পূর্ণ চার্জ দিলে ল্যাপটপ ভেঙ্গে ৫ ঘণ্টা থেকে ১০ বা ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত পাওয়ার ব্যাকআপ পাওয়া যেতে পারে। আর এর ব্যটারির রক্ষণাবেক্ষণ যত ভালোভাবে করা যায়, এর আয়ুষ্কাল হয় তত বেশি হয় এবং ব্যাকআপ পাওয়ার পরিমাণও বাড়ে। ল্যাপটপের ব্যাটারির রক্ষণাবেক্ষণ তাই ব্যবহারকারীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

ল্যাপটপ ব্যাটারির পরিচিতি

ল্যাপটপের ব্যাটারি হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত হয়ে থাকে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি। রিচার্জেবল ব্যাটারি হিসেবে সবচেয়ে বেশি কার্যক্ষম এই ধরনের ব্যাটারির ব্যবহারই সবচেয়ে বেশি। কেবল ল্যাপটপেই নয়- পিডিএ, ট্যাবলেট পিসি, স্মার্টফোনসহ অন্যান্য বহনযোগ্য ডিভাইসেও ব্যবহূত হয় এই লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি। এর আগে অবশ্য ল্যাপটপগুলোয় অনেক বেশি ব্যবহূত হতো নিকেল-মেটাল হাইড্রাইড ব্যাটারি। তবে নিকেল মেটাল-হাইড্রাইড ব্যাটারির তুলনায় লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির আয়ুষ্কাল এবং ব্যাক-আপ দেবার সক্ষমতা অনেক বেশি বলে এখন লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিই ব্যবহূত হচ্ছে ল্যাপটপে।

 

লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির সুবিধা

লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির বেশ কিছু সুবিধার কারণে এটি ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এর সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে-

n অন্যান্য সমান ক্ষমতাসম্পন্ন রিচার্জেবল ব্যাটারির চেয়ে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির ওজন অনেক কম। এর ইলেকট্রোড তৈরিতে ব্যবহূত লিথিয়াম এবং কার্বন- উভয়ের ওজনই অনেক কম।

n লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির আরেকটি সুবিধা হচ্ছে এর শক্তি ঘনত্ব অনেক বেশি। লিথিয়াম ধাতু হিসেবে অনেক বেশি সক্রিয় বলে এর আন্তঃআণবিক বন্ধনগুলো অনেক বেশি শক্তি ধারণে সক্ষম। ফলে ছোট আকৃতির ব্যাটারির শক্তিও তুলনামূলকভাবে বেশি হয়ে থাকে।

n এই ব্যাটারির চার্জ ধারণ ক্ষমতা অনেক বেশি। চার্জিত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি একমাসে মাত্র ৫% চার্জ হারায়। নিকেল-মেটাল হাইড্রাইডে এই পরিমাণ ২০%।

n মেমোরির উপর এই ব্যাটারি প্যাকের কোনো ধরনের প্রভাব নেই। অর্থাত্ একে রিচার্জ করার জন্য সম্পূর্ণ রূপে ডিসচার্জ করার কোনো প্রয়োজন নেই।

n লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি চার্জ/ডিসচার্জ সাইকেল অনেক বেশি। অর্থাত্ এর আয়ুষ্কালের মধ্যে ব্যাটারির চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে চার্জ/ডিসচার্জ করা যায়।

 

লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি প্যাক পরিচিতি

মোবাইল ফোনের ব্যাটারি থেকে শুরু করে ল্যাপটপেও ব্যবহূত হচ্ছে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি। আবার ল্যাপটপের আকার ভেদেও এই ব্যাটারির আকৃতি বিভিন্ন রকম হয়। তবে সব আকারের ব্যাটারির ভেতরের গঠনটা প্রায় একইরকমই থাকে। একটি লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির প্যাকে যা থাকে সেগুলো হলো—

n লিথিয়াম-আয়ন সেল। আকৃতিতে এটি সাধারণ ডাবল এ আকারেরও হতে পারে (সিলিন্ডার আকৃতি), আবার বর্গাকৃতি বা আয়তাকারও হতে পারে।

n ব্যাটারির তাপমাত্রা মনিটর করতে থাকে এক বা একাধিক টেম্পারেচার সেন্সর।

n ভোল্টেজ এবং কারেন্টের মাত্রা সঠিক পরিমাণে রাখতে ভোল্টেজ কনভার্টার এবং রেগুলেটর সার্কিট।।

n ল্যাপটপ বা নোটবুকে শক্তি সরবরাহে নোটবুক কানেক্টর

n ব্যাটারি প্যাকের প্রতিটি সেলের শক্তি ক্ষমতা মনিটরে ভোল্টেজ ট্যাপ

n ব্যাটারি চার্জ স্টেট মনিটর মনিটর যা দ্রুত ব্যাটারির চার্জকে সম্পন্ন করে।

চার্জ দেবার সময় বা ল্যাপটপ ব্যবহারের পরিপার্শ্বের তাপমাত্রার কারণে যদি ব্যাটারি অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়, তাহলে স্টেট মনিটরের সাহায্যে এটি ল্যাপটপকে বন্ধ করে দেয়। আবার ব্যাটারির চার্জ সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়ে গেলেও এটি ল্যাপটপ বন্ধ করে দেয়। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত দূর্ঘটনা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

 

লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি সেল

মূল ব্যাটারি বলতে যে অংশটি, সেটি হচ্ছে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি সেল। প্রতিটি সেলে থাকে তিনটি মূল অংশ—

১. পজিটিভ ইলেকট্রোড বা ধ্বনাত্মক তড়িত্দ্বার (ক্যাথোড)

২. নেগেটিভ ইলেকট্রোড বা ঋণাত্মক তড়িত্দ্বার (অ্যানোড) এবং

৩. সেপারেটর বা পৃথকারক।

একটি ধাতব আবরণের মধ্যে এই অংশগুলো থাকে। পাশাপাশি এর মধ্যে থাকে একটি জৈব দ্রবণ যা তড়িত্ বিশ্লেষ্য দ্রব্য হিসেবে কাজ করে। সাধারণত ধনাত্মক তড়িত্দ্বারটি তৈরি হয় লিথিয়াম কোবাল্ট কার্বন-ডাই-অক্সাইড (LiCoCO2) দিয়ে এবং ঋনাত্মক তড়িত্দ্বার তৈরি হয় কার্বনের সাহায্যে। ব্যাটারি চার্জের সময় ধ্বনাত্মক তড়িত্দ্বার থেকে লিথিয়াম আয়ন ঋণাত্মক তড়িত্দ্বারে ধাবিত হয় এবং ডিসচার্জের সময় বিপরীত ঘটনাটি ঘটে থাকে।

ল্যাপটপ ব্যবহারের সময় বা চার্জের সময় ব্যাটারিটি উত্তপ্ত হয়ে গেলে এই ধাতবগুলো সেপারেটর-এর খুব কাছে চলে আসে এবং তাদের গতির ফলে সেপারেটরে ছিদ্র হয়ে যেতে পারে যা সেলের মধ্যে শট সার্কিট ঘটায়। শর্ট সার্কিট হয়ে গেলে যে ঘটনাগুলো ঘটতে পারে, তা হলো—

n এটি স্পার্ক তৈরি করতে পারে যা দাহ্য তরলে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে।

n খুব দ্রুত তাপমাত্রা বৃদ্ধি করতে পারে এবং অতিরিক্ত তাপমাত্রা ব্যাটারিকে বিস্ফোরিত করতে পারে।

n তাপমাত্রা যদি খুব ধীরে বৃদ্ধি করে এবং বর্ধিত তাপমাত্রা অনেক সময় ধরে স্থায়ী হয়, সেক্ষেত্রে ব্যাটারির বহিরাবরণ গলে গিয়ে দাহ্য তরল বাইরে চলে আসতে পারে।

বর্তমান সময়ে সকলেই চান ল্যাপটপের আকার হোক ছোট আর ওজন হোক কম। পাশাপাশি তারা চায় উচ্চমানের ডিসপ্লে এবং অধিক গতিসম্পন্ন প্রসেসর। এসব কারণে ল্যাপটপ নির্মাতাদের এমন ধরনের ব্যাটারির দিকে নজর দিতে হচ্ছে যা আকারে ছোট কিন্তু উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন। এটি করতে গিয়ে ব্যাটারির সব অংশকেই ছোট আকার বিশিষ্ট করে তৈরি করতে হচ্ছে কিন্তু এগুলোর ক্ষমতা অপরিবর্তিত রাখতে হচ্ছে। সেপারেটরগুলোও হচ্ছে ছোট আর পাতলা। মূলত এর ফলেই ব্যাটারিতে শট সার্কিট হবার হার বেড়ে গেছে অনেকখানি।

 

ব্যাটারি সুরক্ষিত রাখতে যা করণীয়

ল্যাপটপের ব্যাটারির পারফরম্যান্স বাড়ানোর জন্য নিচের পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে।

n পিসি ডিফ্র্যাগমেন্ট করা : ল্যাপটপের হার্ডডিস্ক যত দ্রুত কাজ করতে, ব্যাটারি উপর চাপ পড়ে তত কম। তাই হার্ডডিস্কের পারফরম্যান্স বাড়াতে নিয়মিত ডিফ্রাগমেন্ট চালানো প্রয়োজন। উইন্ডোজের বিল্ট-ইন ডিফ্র্যাগমেন্ট-এর বাইরেও ডিফ্র্যাগমেন্ট করার জন্য আলাদা অ্যাপ্লিকেশন পাওয়া যায়।

n ডিসপ্লের উজ্জ্বলতা কম রাখা : মনিটরের উজ্জ্বলতা ব্যাটারির চার্জ কমাতে বড় ভূমিকা রাখে। তাই মনিটরের উজ্জ্বলতা প্রয়োজনের সময় ছাড়া কম রাখা উচিত। বেশিরভাগ ল্যাপটপেই মনিটরের মোড নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকে। সেই সুবিধা গ্রহণ করা উচিত।

n ব্যাকগ্রাউন্ড প্রোগ্রাম বন্ধ রাখা: অনেক সময়ই পিসিতে কাজ করতে গেলে আমাদের অলক্ষ্যেই অনেক প্রোগ্রাম রান করে। ডেস্কটপ সার্চ, আইটিউনসসহ এসব প্রোগ্রামও বন্ধ রাখলে ব্যাটারির চার্জ কম খরচ হয়।

n এক্সটার্নাল ডিভাইস বন্ধ রাখা :এক্সটার্নাল ইউএসবি ডিভাইস, ওয়াইফাই বা ব্লুটুথ ব্যাটারির প্রচুর চার্জ খরচ করে। তাই প্রয়োজন না থাকলে এসব ডিভাইস যথাসম্ভব খুলে রাখা প্রয়োজন। এছাড়া ল্যাপটপের মাধ্যমে মোবাইল বা অন্যান্য ডিভাইস চার্জ দিলেও খুব দ্রুত চার্জ শেষ হয় ল্যাপটপের

n বেশি র্যাম ব্যাবহার করা :যাদের বিভিন্ন কাজে ভার্চুয়াল মেমোরির ব্যবহার বেশি করতে হয়, তারা অতিরিক্ত র্যাম ব্যবহার করতে পারেন। বেশি র্যাম চালাতে বেশি শক্তি প্রয়োজন হলেও তার পরিমাণ ভার্চুয়াল মেমোরির চেয়ে কম।

n সিডি/ডিভিডি’র ব্যবহার কমানো :ব্যাটারীর খরচে শীর্ষে থাকে সিডি/ ডিভিডি রম বা রাইটার। তাই এসব ডিভাইস যত কম সম্ভব ব্যবহার করা উচিত। আর বিকল্পে ভার্চুয়াল সিডি/ডিভিডি ড্রাইভ ব্যবহার করা যেতে পারে।

n ব্যাটারির সংযোগস্থল পরিস্কার রাখা:ব্যাটারির সাথে ল্যাপটপের সংযোগস্থলে যে ধাতব আবরণ থাকে, তা নিয়মিত পরিস্কার রাখা। এতে করে চার্জ স্থানান্তর আরো সুষ্ঠু হয়। প্রতি দুই মাস বা তিন মাস অন্তর অন্তর স্পিরিট দিয়ে সংযোগস্থলগুলো মুছে দেয়া যেতে পারে।