কমলনগরে দুর্যোগ-সহনীয় ঘর বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ

‡jv এম এ মজিদ, কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) সংবাদদাতা

কমলনগর উপজেলায় দুর্যোগ-সহনীয় ঘর বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সচ্ছল ও অবস্থাসম্পন্ন পরিবারকে ঘর দেওয়ায় বঞ্চিত হয়েছে প্রকৃত অসহায় পরিবারগুলো। জানা যায়, গৃহহীনদের জন্য দুর্যোগ-সহনীয় ঘর নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় কমলগরে ২৯টি ঘর নির্মাণ করা যায়।

দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রাণালয়ের একটি সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের উপকারভোগীরা হবে গৃহহীন ও অসচ্ছল। নদীভাঙনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় পরিবারগুলো অগ্রাধিকার পাবে। প্রতিটি ঘর নির্মাণে খরচ বাবদ ব্যয় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৫৩১ টাকা।

অভিযোগে জানা যায়, উপজেলার ৭ নম্বর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা মেম্বার নাসরিন আক্তার নয়ন তার প্রবাসী জামাতা দেলোয়ার হোসেনের নামে ঘর বরাদ্দ এনে নিজের জায়গায় তা নির্মাণ করছেন। উপজেলার চর মার্টিন ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের জয়নাল আবেদিনের নামে ঘর বরাদ্দ হলেও প্রকৃতপক্ষে ঘর হস্তগত করেছেন ওই ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পল্লি চিকিত্সক সবুজ। এদিকে তালিকায় কবির হোসেনের নাম লেখা থাকলেও সংশ্লিষ্ট ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘এই নামের কোনো ব্যক্তি আমার ওয়ার্ডে নেই।’ উপজেলা আওয়ামী মত্স্যজীবী সমিতির সভাপতি আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা আবুল খায়ের জানান, মার্টিন ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে হোসেন আহম্মদ আমার নিকট স্বীকার করেছেন যে তাকে ঘর নিতে প্রায় ৮০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।’ তবে কাকে টাকা দিয়েছেন তা জানাতে অপারগতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, প্রায় প্রতিটি ঘরই আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে হস্তান্তর হয়েছে।

৭ নম্বর হাজিরহাট ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হাছান মাহমুদ আপেল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগে জানান, তার ওয়ার্ডের নিঃস্ব মানুষ ঘর পায়নি, অথচ তার ওয়ার্ডে ৩৬ শতক জমি ক্রয় করে ঘর নির্মাণ করছেন ৫ নম্বর চর ফলকন ইউনিয়নের জনৈক আনোয়ার হোসেনের ছেলে আলমগীর হোসেন।

অভিযোগের বিষয়ে নাসরিন আকতার নয়নের জামাতা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি বিদেশে থাকি। আমি নিজে বড় করে দালানঘর নির্মাণ করছি, আমি কেন গরিবের ঘর নিব? এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।’ এ ব্যাপারে নয়ন মেম্বার বলেন, ‘আমার নিজের তো দেওয়ালঘর আছে, জামাইয়ের নামে ঘর এনে আমার জায়গায় নির্মাণ করছি বটে, তবে আমি গরিব মানুষকেই থাকতে দিব!’ গরিব মানুষের নামে ঘর চাইলেন না কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আসলে আমি নিজের আত্মীয়স্বজনের নামেই সব বরাদ্দ আনি।’

৭ নম্বর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘আমি পাঁচ জনের নামের তালিকা জমা দিয়েছিলাম, তার মধ্যে পাতার ছাউনি দেওয়া ঘরে বসবাসকারী পরিবার, একটি ভাঙা ঘরে সাত ভাই ঠাসাঠাসি করে বসবাস করছে, তাদের নামও তালিকায় ছিল। কিন্তু তারা ঘর বরাদ্দ পায়নি, বরাদ্দ পেল মহিলা মেম্বারের বিত্তবান জামাতা। আপনার দেওয়া তালিকায় দেলোয়ারের নাম ছিল এমন প্রশ্নের জাবাবে তিনি বলেন, ‘মেম্বার আমাকে বলেছিলেন দেলোয়ার গরিব মানুষ। এ ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাবুল মেম্বারও তার বোনের নামে ঘর বরাদ্দ নিয়ে নিজ বাড়িতে নির্মাণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।’

এদিকে ৪ নম্বর চর মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইউসুফ আলী বলেন, ‘আমি আমার ইউনিয়ন থেকে পাঁচ জন উপকারভোগীর নামের তালিকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর পাঠিয়েছি। তার মধ্যে এক জন ঘর পেয়েছেন। আরো দুই জন মোটামুটি সচ্ছল ব্যক্তি আমার ইউনিয়নে ঘর পেয়েছেন। তবে তাদের চাইতেও অনেক হতদরিদ্র ব্যক্তি রয়েছে, তারা ঘর পেল না।’

গত ২১ আগস্ট উপজেলা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির সভায় সংশ্লিষ্ট বিষয়টি উত্থাপিত হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও এই প্রকল্পের তত্ত্বাবধানকারী ইমতিয়াজ হোসেন বলেন, ‘উপকারভোগীদের তালিকা তৈরি করার সময় খুব কম পাওয়া গেছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়াম্যানগণ যে তালিকা প্রদান করেছেন, তদন্তে সেই তালিকায় অসংগতি ধরা পড়ায় ইউনিয়নের তহশিলদার দিয়ে নামের তালিকা তৈরি করেছি।’ নয়ন মেম্বারের নাম কীভাবে তালিকাভুক্ত হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিছু অসংগতি তো থেকেই গেল। তবে এখন আর কিছুই করার নেই। কারণ জেলা প্রশাসক মহোদয় অনুমোদন করে ফেলেছেন।

তিনি আরো জানান, তবে কিছু নাম ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গের অনুরোধে দিতে হয়েছে। প্রকল্পসমূহের কাজ পিআইসির মাধ্যমে না করে আপনি নিজেই করছেন এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নেই, তাই আমাকেই কাজ করতে হচ্ছে।’