নয়া সংকটে সিরিয়া

হাসান জাবির

ইউফ্রেটিস নদীর পূর্ব তীরের কুর্দি-নিয়ন্ত্রিত সিরীয় ভূমিতে প্রতিবেশী তুরস্কের পূর্বপরিকল্পিত সেনা অভিযান মধ্যপ্রাচ্য সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এর মধ্য দিয়ে ক্রমশ স্থিতিশীলতার দিকে অগ্রসর সিরীয় পরিস্থিতি নতুন করে সংকাটাপন্ন হয়ে পড়ল বলে মনে করা হচ্ছে। (যদিও সফররত মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনার পর তুরস্ক পাঁচ দিনের যুদ্ধ বিরতিতে সম্মত হয়েছে, কিন্তু সিরিয় ডেমোক্র্যাটিক ফোর্স দাবী করেছে যে তুরস্ক তা কার্যকর করছে না। শুক্রবারও ওই এলাকায় গোলাগুলির শব্দ পাওয়া গেছে বলে প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে।) গত সপ্তাহের শুরু থেকে চলমান টার্কি সেনা অভিযানের প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে কুর্দি জনগোষ্ঠী ও তাদের প্রতিনিধিত্বকারী বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপ। যারা আবার দীর্ঘকাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সমর্থনে পরিপুষ্ট। অন্যদিকে সাত বছর আগে সিরীয় গৃহযুদ্ধের শুরু থেকেই এসব কুর্দি সশস্ত্র গ্রুপ সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। কিন্তু গত বছর থেকে সিরিয়ান বাহিনীর ব্যাপক সাফল্যের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। এর আগে দেশের প্রায় সমগ্র এলাকায় সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয় সরকারি বাহিনী। এর পরিপ্রেক্ষিতে মাস ছয়েক আগে দামেস্কের ঘনিষ্ঠ মিত্র রাশিয়ান ফেডারেশনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ সিরীয় যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘোষণা করেন। এতদসত্ত্বেও ইউফ্রেটিস নদীর পূর্ব তীরের বিস্তীর্ণ সিরিয়ার উত্তর-পূর্ব এলাকায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যর্থ হয় সিরীয় সেনারা। আর এর পরিপ্রেক্ষিতে তুরস্ক সিরীয় সীমান্তের এই অঞ্চলে জড়ো হয় সব বিদ্রোহী গোষ্ঠী। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যরাই হচ্ছেন কুর্দি, যারা আবার আন্তর্জাতিক সমর্থনের জেরে বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত। বিশেষত ওয়াইপিজে, এসডিএফ, এফএসএ ইত্যাদি। মূলত প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতার অংশ ইউফ্রেটিস নদীর পূর্ব তীরের দেইর আল জহর তত্সংলগ্ন মনবিজ, তেল আবিয়াত, রাস আল আইন ঘিরে কুর্দিদের তত্পরতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। এরই প্রেক্ষাপটে ওই অঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে বেশ চিন্তিত ছিলেন দেশটির সরকারি বাহিনী। এই অঞ্চলের কর্তৃত্ব ফিরে পেতে সিরিয়া ও রাশিয়ার অনেক পরিকল্পনাও ভেস্তে যায়। ফলে যুদ্ধের সমাপ্তি সত্ত্বেও ইউফ্রেটিস নদীর পূর্ব তীরের এই ভিন্ন বাস্তবতা সিরিয়ার জন্য স্থায়ী হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একই সঙ্গে এখানে সুসংগঠিত কুর্দিরা পার্শ্ববর্তী দেশ তুরস্কের জন্যও মারাত্মক হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়। অন্যদিকে সিরীয় সংকটের বিভিন্ন অধ্যায় শেষে এই অঞ্চলেই অবস্থান করছিল মার্কিন সেনারা। ওয়াশিংটনের এই বাস্তবিক অবস্থান নিজের মিত্র কুর্দি গ্রুপগুলোকে বরাবর উজ্জীবিত রাখতে সহায়তা করে আসছে। ফলে ওই অঞ্চলে সিরিয়া রাশিয়ার সর্বাত্মক সামরিক অভিযান প্রচেষ্টার প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। এই সমীকরণে সিরিয়ার অভ্যন্তরে টার্কি সেনাদের অভিযান ব্যাপক ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। একই সঙ্গে এখানের ভিন্ন বাস্তবতা ঘিরে সিরিয়া সংকটে সক্রিয় পক্ষগুলোর নিজ নিজ স্বার্থগত দ্বন্দ্ব অনেক ক্ষেত্রেই দ্বিপাক্ষিক জাতীয় মৈত্রির ঊর্ধ্বে, যে কারণে টার্কি সেনা অভিযানের ভেতর দিয়ে সিরিয়া পরিস্থিতিতে সত্যিকার অর্থেই সব পক্ষ নিজ নিজ স্বার্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। যদিও সিরীয় সংকটের অন্যতম কৌশলগত পক্ষ ইরান এবং ইউরোপ এমনকি আরব লিগ এই অভিযানের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। একই সঙ্গে অনেকটাই অস্পষ্ট অবস্থানে আমেরিকা ও রাশিয়া। যদিও দুই দিন আগে রাশিয়ার পক্ষ থেকে এই অভিযানের যৌক্তিকতা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করা হয়। আবার আমেরিকা তার দীর্ঘদিনের মিত্র কুর্দিদের বিরুদ্ধে টার্কি অভিযানের সুযোগ করে দেওয়ায় ওয়াশিংটনের অবস্থানও অস্পষ্ট, যে কারণে তুরস্কের সেনা অভিযান-সম্পর্কিত সত্যিকার উপলব্ধি ও এর সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা কিছুটা দুরূহ। তবে টার্কি অভিযানের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে কুর্দি যোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণ করে আকাংকার স্বাধীনতাকামী কুর্দি পিকেকেকে সর্বাত্মকভাবে দমন। এর মধ্য দিয়ে দেশটির জাতীয় অখণ্ডতা-সম্পর্কিত সব ঝুঁকি শূন্যে নামিয়ে আনা তুরস্কের কাছে অগ্রাদিকার পাচ্ছে। একই সঙ্গে তুরস্কে অবস্থান নেওয়া প্রায় ৩০ লাখ সিরীয় উদ্বাস্তুকে ইউফেট্রিস নদীর পূর্ব তীরের বিস্তীর্ণ এলাকায় পুনর্বাসন-সংক্রান্ত সিরীয় সরকারের অনুমোদনহীন আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ উথলে দেওয়া। সম্ভবত এই  আলোকেই তুরস্কের চলমান অভিযানে আমেরিকা নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেনি। এর ফলে ইউফ্রেটিস নদীর পূর্ব তীরের বিস্তীর্ণ ভূমি স্থায়ীভাবে হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কায় আছে সিরিয়া। যদিও টার্কি সেনা অভিযানের আগে সিরিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মিকতাদা আংকারার প্রতি সর্বাত্মক হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তার ভাষায়, সিরিয়া যে কোনো মূল্যে মাতৃভূমির প্রতি ইঞ্চি জমি সন্ত্রাসীদের হাত থেকে উদ্ধার করতে সক্ষম। তাই ইউফ্রেটিস নদীর পূর্ব তীরে তুরস্কের চলমান অভিযানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া সিরীয় যুদ্ধের গতিপথে ভিন্ন মাত্রা এনে দেবে—সেটি প্রায় পরিষ্কার। প্রশ্ন হচ্ছে, সম্ভাব্য প্রক্রিয়া কিংবা পথটি কেমন হবে?

আরব অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৃতাত্ত্বিক জাতি-গোষ্ঠী হচ্ছে কুর্দি। সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে প্রায় সাড়ে তিন কোটি কুর্দি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই আছে তুরস্ক, ইরাক, সিরিয়া ও ইরানে। তুরস্কের জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশই হচ্ছে কুর্দি। যারা ঐতিহাসিক কাল থেকেই তুরস্কের ভেতরে একটি স্বতন্ত্র কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু লুসান চুক্তির আওতায় কুর্দিদের এই আশা দুরাশায় পরিণত হয়। আর আধুনিক ইতিহাস হলো—তুরস্ক কর্তৃক স্বাধীনতাকামী কুর্দিদের দমনপীড়ন। সংগত কারণেই তুরস্কের সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় মার্কিন সমর্থনপুষ্ট সিরিয়া ও আশপাশের দেশের কুর্দিদের সশস্ত্র বিচরণ আংকারার চিন্তার কারণ হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষিতেই সিরিয়ায় দেশটির সেনা অভিযান। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এতে করে তুরস্কের পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়ন হতে পারে?    

সিরিয়ান আরব রিপাবলিক ও ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য তুরস্কের মধ্যে ’৯৮ সালে সম্পাদিত একটি চুক্তি হচ্ছে ‘আদানা চুক্তি’। যে চুক্তির মূল বিষয় হচ্ছে—সিরিয়া তার নিজ ভূমিতে কুর্দিদের তুরস্কবিরোধী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করবে। এই চুক্তির আওতায় সিরীয় কুর্দিদের তুরস্কবিরোধী কর্মকাণ্ড দমনে দেশটি প্রতিশ্রতিবদ্ধ। কিন্তু তুরস্ক সিরিয়াকে সেই সুযোগ না দিয়ে নিজেই একটি স্বাধীন দেশের সীমানা অতিক্রম করে যে অভিযান চালাচ্ছে, সেটি অনেকভাবেই ন্যায্যতার ঘাটতি আছে। তাই এই অভিযান প্রথমেই সিরিয়া, রাশিয়া, ইরান ও লেবাননের মতো দেশগুলোর সঙ্গে আংকারার সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ইতোমধ্যে এই অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার আলি লারিজানির পূর্বনির্ধারিত তুরস্ক সফর বাতিল করেছে তেহরান। অন্যদিকে আরব লিগের বৈঠকে মিত্র সিরিয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়ে লেবাননের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টার্কি অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।

তুরস্ক মনে করছে, এই অভিযানের মধ্য দিয়ে ইউফ্রেটিস নদীর পূর্ব তীরে নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। আর এই নিরাপদ অঞ্চলে গৃহযুদ্ধে বাস্তুচ্যুত সিরীয় অভিবাসীদের পুনর্বাসন করাও সম্ভব। কিন্তু সিরীয় সরকারের অনুমোদন ছাড়া এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না। অন্যদিকে সিরীয় সরকারের অগোচরে এমন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা সংকটে আরো জটিলতা তৈরি করবে। এ ধরনের প্রচেষ্টা রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্রের উদ্ভব করতে পারে; যা ইউফ্রেটিস নদীর পূর্ব তীরে সিরিয়ার সামরিক অভিযানকে অনিবার্য করে তুলবে এবং সিরিয়া-তুরস্ক সীমান্তে উত্তেজনার স্থায়িত্ব আনবে। এ নিয়ে রাশিয়া আগেও বহুবার সবাইকে সতর্ক করেছে। কিন্তু এখন তুরস্কের অভিযানের পর থেকে সব পক্ষই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তারা সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে অগ্রসর হবেন। কিন্তু তুরস্কের এমনটি ভাবা হবে মারাত্মক ভুল যে, টার্কি অভিযান শেষে সিরিয়ার ভৌগোলিক সীমারেখার কোনো ধরনের পরিবর্তন এলে দামেস্ক চুপচাপ থাকবে। এখানে উল্লেখ করতে হয় যে, সিরীয় শরণার্থীদের দেশে ফেরানোর সব প্রচেষ্টাই হতে পারে দামেস্কের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে। এর অন্যথা ঘটলে দামেস্ক সেটি মেনে নেওয়ার মতো অবস্থানে নেই। এমনকি আঞ্চলিক রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণও সিরিয়া বিরোধীদের প্রতিকূলে। এই অবস্থায় সিরিয়া সংকটের ইতিবাচক অগ্রগতির সঙ্গে সংগতিহীন টার্কি সেনা অভিযান আংকারার মনোবাসনা পূরণে সক্ষম হবে না। বিশেষ করে কুর্দিরা সিরিয়ান সরকারের সঙ্গে আলোচনার যে ইঙ্গিত দিয়েছে, তার ফলাফল তুরস্কের জন্য আরো চিন্তার কারণ হয়ে উঠবে নিঃসন্দেহে। এই প্রেক্ষিতে এই অভিযানের সার্থকতা নিয়ে সবাই সন্দিহান।

n লেখক :আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক