নিজের ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য শিক্ষক হতে চেয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের হরিজন সম্প্রদায়ের সনু রানী দাস। পিছিয়ে পড়া ও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত নিজ সম্প্রদায়ের মানুষদের জন্য কাজ করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর হয়ে উঠল না। শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন তার অপূর্ণই থেকে গেল। প্রতিভাবান এই নারীর প্রতিভা শুধু কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থীকে টিউশন দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে গেল। এরই সঙ্গে অন্ধকারাচ্ছন্ন হরিজন সম্প্রদায়ের ভবিষ্যত্ সেই অন্ধকারেই পড়ে রইল।
টানবাজার সুইপার কলোনির প্রথম গ্র্যাজুয়েটধারী সনু রানী দাস পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও হাজার বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে স্কুল থেকে কলেজ ও কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় পৌঁছেছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করেছেন বিভিন্ন এনজিওর সঙ্গে। হরিজন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বও করেছেন। প্রথমে স্কটল্যান্ডে গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে অংশ নেন তিনি। বাংলাদেশ ও স্কটল্যান্ডের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ঐ কর্মসূচির অংশ হিসেবে সনু সেখানে ছিলেন তিন মাস। এরপর তিনি জেনেভায় যান হিউম্যান রাইটসের এক সম্মেলনে অংশ নিতে। সেখানে ৭ মিনিটের এক ভাষণে তুলে ধরেন রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দলিত সম্প্রদায়ে নারীদের অবস্থান, যা সেই সম্মেলনে সকলের প্রসংশা কুড়ায়। এরপর বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে আসে তার সাফল্যের কাহিনী। দেশবাসীর কাছে সনু পরিচিত হয়ে ওঠেন একজন আদর্শ নারী হিসেবে। এতে অনুপ্রাণিত হন হরিজন সম্প্রদায়ের অনেকেই।
সনু রানী দাসকে নিয়ে প্রথমে দৈনিক ইত্তেফাক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর তা দেশব্যাপী আলোচিত হয়। এরপর একে একে দেশের জনপ্রিয় সব গণমাধ্যমে ফলাও করে তার সম্পর্কে লেখা হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসিও তাকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এক সময় ব্যাপক আলোচনায় ও সবার মধ্যমণি হয়ে থাকা সনু রানী ধীরে ধীরে আলোচনার বাইরে চলে যান। তবে নিজ ভাষাভাষিদের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন তাকে ছেড়ে যায় না। স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে ২০১৮ সালের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ১৭ লাখ ৭৩ হাজার ৯১৭ জনের একজন হিসেবে পরীক্ষা দেন তিনি। তবে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া ৫৫ হাজার ২৯৫ জনের মধ্যে তার নাম আসেনি। ফলে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন, রাতের আঁধারে দেখা হাজারো স্বপ্নের ভিড়ে মিলিয়ে যায়। সনু রানী এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘বর্তমানে আমি সম্পূর্ণ বেকার। এ নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলে। এত কিছু করে কি হয়েছে। এত কষ্ট করে পড়াশোনা করে কি লাভ হলো। আমাদের সন্তানদের পড়াশোনা করিয়েই বা কি করব।’ তিনি আরো বলেন, ‘বস্তির কাউকে তাদের সন্তানের শিক্ষা সম্পর্কে পরামর্শ দিতে পারি না। এক সময় আমাকে দেখে অনুপ্রাণিত হওয়া মানুষগুলো এখন আমার উদাহরণ দিয়েই নিজেদের সন্তানকে শিক্ষা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেয়। আমি মাথা নিচু করে শুনে যাই। আমি শিক্ষক হতে পারেনি তার আক্ষেপ তো থাকবেই, তবে তার থেকে বেশি হতাশাজনক হচ্ছে আমার এই সম্প্রদায়ের ভবিষ্যত্। আগামী এক যুগেও এই সম্প্রদায়ের কোনো ভবিষ্যত্ নেই। এই সম্প্রদায়ের মানুষগুলো যেমন পিছিয়ে ছিল তেমনিই থাকবে।’