দেশের আর্থিক খাতে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও পর্যবেক্ষণের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ঋণ প্রদানে অনিয়ম ও ঋণ আহরণে দীর্ঘসূত্রতাও রয়েছে। অন্যদিকে ঋণের সুদহার কমানোর ঘোষণা থাকলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। এসব কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গেছে। ফলে দেশের শিল্পোদ্যোক্তা বিশেষত ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। গতকাল শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে ব্যবসায়ীদের সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই) আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনঃসংস্কার ও ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া এবং স্টেক হোল্ডারদের ওপর এর প্রভাব’ শীর্ষক ঐ সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান। ডিসিসিআই সভাপতি ওসামা তাসীরের সভাপতিত্বে এতে ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তাদের পাশাপাশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রতিনিধিরা তাদের মতামত তুলে ধরেন।
ঋণের উচ্চ সুদহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হলেও তাতে সাড়া মেলেনি। অন্যদিকে সরল সুদের বদলে চক্রবৃদ্ধিহারে সুদ আদায় করে উদ্যোক্তাদের ব্যয় আরো বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে—আলোচনায় বক্তারা এসব ইস্যু তুলে ধরেন। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা আনার ক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর যথাযথ তদারকি জোরদার না থাকার ইস্যুটিও আলোচনায় আসে।
ডিসিসিআই সভাপতি ওসামা তাসীর বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, পর্যবেক্ষণের সীমাবদ্ধতা, ঋণ প্রদানে অনিয়ম ও ঋণ আহরণের দীর্ঘসূত্রতার মতো সমস্যা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ঋণের উচ্চহারের সুদের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এসএমই খাতের উদ্যোক্তারা। আর্থিক খাতে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি ‘আর্থিক খাত সংস্কার কর্তৃপক্ষ’ নামে একটি কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব করেন তিনি।
ড. মসিউর রহমান আর্থিক খাতের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন। পুঁজিবাজারে ভালো প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের অভাব রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের পুঁজিবাজারে ভালো প্রতিষ্ঠানের পর্যাপ্ত শেয়ার নেই। এ কারণে আমরা অল্পসংখ্যক কিছু প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। তিনি উত্পাদনশীল খাতে আরো বেশি হারে বিনিয়োগ এবং ভালো প্রতিষ্ঠানের শেয়ার পুঁজিবাজারে নিয়ে আসার প্রস্তাব করেন। তিনি বিদ্যমান নীতিমালার সংস্কার ও আধুনিকায়ন এবং নীতিমালার অস্পষ্টতা দূর করার ওপর গুরুত্ব দেন।
আইডিএলসি ফিন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ খান ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রদান নিরুত্সাহিত করতে পুঁজিবাজারে বন্ড মার্কেট চালু করার প্রস্তাব করেন। এছাড়া খেলাপি ঋণের প্রবণতা কমাতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুশাসন নিশ্চিত করা, বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি বাড়ানো, খেলাপি ঋণের জন্য দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
সিটি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হোসেন, আর্থিক খাতের বিদ্যমান সমস্যা মোকাবেলায় দুর্বল ব্যাংকগুলোর একত্রীকরণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রভাব বাড়ানো, দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন, মূলধন অনুপাতের পর্যাপ্ততা বাড়ানো, অ্যাডভান্স অন ডিপোজিটের (এডি) অনুপাত না ভঙ্গ করার বাধ্যবাধকতার ওপর গুরুত্ব দেন। এছাড়া খেলাপি ঋণ কমাতে ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেন। এ সময় ডিসিসিআই সহসভাপতি ওয়াকার আহমেদ চৌধুরীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা তাদের মতামত তুলে ধরেন।