যুবলীগ চেয়ারম্যান পদ থেকে ওমর ফারুককে অব্যাহতি

আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন যুবলীগের চেয়ারম্যানের পদ থেকে ওমর ফারুক চৌধুরীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। গতকাল রবিবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যুবলীগের নেতাদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ক্যাসিনোকাণ্ডে যুবলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের যুক্ত থাকার অভিযোগের মধ্যেই ওমর ফারুক চৌধুরীকে সংগঠনের শীর্ষ পদ থেকে বাদ দেওয়া হলো। গতকাল বৈঠক শেষে গণভবন থেকে বেরিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। প্রেসিডিয়াম সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন এমপি, শেখ ফজলুর রহমান মারুফ ও শেখ আতিয়ার রহমান দিপুকেও যুবলীগের কর্মকাণ্ড থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মাধ্যমে যুবলীগকে পুনর্গঠন করা হয়েছে। এর আগে গত ১৪ সেপ্টেম্বর দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে ছাত্রলীগের সভাপতির পদ থেকে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে গোলাম রাব্বানীকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হন যথাক্রমে আল নাহিয়ান খান জয় ও লেখক ভট্টাচার্য। অতীতে কখনো ক্ষমতাসীন দলের যুব ও ছাত্রসংগঠনে এমন পরিবর্তন আনার নজির নেই।

সূত্র জানায়, গতকালের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সম্মেলনের মাধ্যমে যুবলীগকে ঢেলে সাজাতে হবে। বিতর্কিত কেউ যুবলীগে থাকতে পারবেন না। ক্লিন ইমেজের সত্ ও দক্ষ নেতাদের নেতৃত্বে আনার নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারের অর্জন অনেক। সারাবিশ্বে আমরা প্রশংসিত হচ্ছি। উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। এক্ষেত্রে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত যারা অবৈধভাবে অর্থের মালিক হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘কারও অপকর্মের দায় দল ও সরকার নেবে না। যারা অপকর্ম করেছেন, দুর্নীতি করেছেন, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও ক্যাসিনো ব্যবসায় জড়িত ছিলেন, তাদের ছাড়া হবে না। কারো অন্যায় কর্মকাণ্ডের কারণে দল ও সরকারের দুর্নাম হতে দেব না। কারো কারণে দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে না। আমার উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও আদর্শ কারো অপকর্মের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হতে দেব না।’

এদিকে আগামী ২৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য যুবলীগের সপ্তম জাতীয় কংগ্রেস প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে সংগঠনের প্রেসিডিয়াম সদস্য চয়ন ইসলামকে। আর সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদকে করা হয়েছে সদস্যসচিব। হারুনুর রশীদ গতকাল রাতে ইত্তেফাককে জানান, যুবলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সবাই সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। আর সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটিই এখন যুবলীগের মূল কমিটি। সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্বের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তর পর্যন্ত সার্বিক কর্মকাণ্ড চালাবে এই প্রস্তুতি কমিটি। জানা গেছে, ওমর ফারুক চৌধুরীসহ উল্লিখিত তিন প্রেসিডিয়াম সদস্যকে যুবলীগের সব কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তাদের সবাইকে অব্যাহতি দিতে নেত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে চেয়ারম্যানকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।’ এদিকে কেন্দ্রীয় যুবলীগের সম্মেলনের পর যুবলীগ ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের সম্মেলনের নির্দেশনা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। এদিকে বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যুবলীগের নেতাদের বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫ বছর। অনূর্ধ্ব ৫৫ বছর বয়সিরা এবার যুবলীগের নেতৃত্বে আসতে পারবেন। ১৯৭৪ সালে যুবলীগের প্রথম জাতীয় কংগ্রেসে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বঙ্গবন্ধুর ভাগনে শেখ ফজলুল হক মনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মাত্র ৩৩ বছর বয়সে। ওই সময় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ৪০ বছর বয়সসীমার বিধান ছিল। তবে ১৯৭৮ সালে অনুষ্ঠিত সংগঠনটির দ্বিতীয় জাতীয় কংগ্রেসে ঐ বিধান বিলুপ্ত করা হয়।

গতকালের বৈঠকে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু বলেন, আগামী সম্মেলনের মাধ্যমে সঠিক নেতৃত্ব এনে যুবলীগের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে হবে। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘যুবলীগের বিরুদ্ধে যেসব খবর গণমাধ্যমে আসছে, তা দেখে আমি হতবাক।’ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, যুবলীগের আসন্ন কংগ্রেসে বিতর্কিতদের বাদ দিতে হবে।

গণভবনে যুবলীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার এ বৈঠকে যুবলীগের নেতাদের মধ্যে প্রথমে বক্তব্য রাখেন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ। তারপর যথাক্রমে বক্তব্য রাখেন যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট বেলাল হোসেন, সাইদুর রহমান শহীদ (শহীদ সেরনিয়াবাত), কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক সুব্রত পাল, মহিউদ্দিন মহি, সাংগঠনিক সম্পাদক আমির হোসেন গাজী, ফারুক হাসান তুহিন ও প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার নিখিল গুহ। কয়েকজন তাদের বক্তব্যে ওমর ফারুক চৌধুরীর সমালোচনা করলে তারা আগে কেন এসব বলেননি বলে প্রশ্ন রাখেন শেখ হাসিনা। প্রায় আড়াই ঘণ্টার বৈঠকে যুবলীগের যাদের বিরুদ্ধে নানা অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে, তাদের সংগঠন থেকে অব্যাহতির সিদ্ধান্ত হয়।

বৈঠক সূত্র জানায়, ওমর ফারুক চৌধরীর একক কর্তৃত্বে যুবলীগে বিতর্কিতদের পদ দেওয়া, কমিটি ভাঙা, নতুন কমিটি গঠন, বিতর্কিত নেতাদের প্রশ্রয় দেওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সামনে অভিযোগ তুলে ধরেন শহীদ সেরনিয়াবাত। পাশাপাশি বর্তমান সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদের ওপরও এসব দায় বর্তায় বলে তিনি মন্তব্য করেন। তখন প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত যুবলীগ নেতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘এসব অভিযোগ আগে জানানো উচিত ছিল।’