শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ

বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে শিক্ষাব্যবস্থার প্রভূত উন্নয়ন ঘটিয়াছে। ব্যক্তি ও সামষ্টিক উদ্যোগে দেশে হাজার হাজার স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। যেসব শিক্ষানুরাগী এইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন তাহারা সমাজে চিরস্মরণীয় হইয়া আছেন। কিন্তু যে কোনো প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা যত সহজ, টিকাইয়া রাখা ততই কঠিন। এইসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে যাহারা থাকেন, কিছুদিন না যাইতেই তাহাদের মধ্যে দায়িত্বশীলতা ও একনিষ্ঠতার অভাব দেখা দেয়। একসময় নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগও উঠিতে থাকে যাহা প্রতিষ্ঠানের উন্নতির  ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেই অভিযোগ সত্য বলিয়া প্রমাণিত হয়। দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও তাহা প্রযোজ্য। এইসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা তদারকি ও লেখাপড়ার মানোন্নয়নের জন্য সৃষ্টি করা হইয়াছে পরিচালনা পর্ষদ। স্কুলে এই পর্ষদের নাম ম্যানেজিং কমিটি এবং কলেজে গভর্নিং বডি। ইহার জন্য সরকারের একটি বিধিমালা আছে যেইখানে পর্ষদগুলির সুনির্দিষ্ট ১৬টি দায়িত্বের কথা বলা হইয়াছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হইল, এইসব নিয়ম পালনে পরিচালনা পর্ষদের বাধ্যবাধকতা থাকিলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাহা পালন করা হয় না। নিয়োগ-ভর্তিবাণিজ্য, ফান্ড হইতে বেনামে অর্থখরচসহ নানা অনিয়মের হোতা হইল এইসব পর্ষদ, যাহার কারণে অনেক সময় শিক্ষকরা তটস্থ থাকেন। প্রধান শিক্ষক বা প্রিন্সিপ্যাল শেষ পর্যন্ত অনেক সময় অনিয়মকারীদের সহযোগী হইতে বাধ্য হন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্বগুলি হইল—প্রতিষ্ঠানের জন্য জমি, ভবন, খেলার মাঠ, বই, ল্যাবরেটরি, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণের ব্যবস্থা করা, প্রতিষ্ঠানের তহবিল সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা, ডোনেশন সংগ্রহ, শিক্ষক নিয়োগ, সাময়িক বরখাস্ত ও অপসারণ, বার্ষিক ও উন্নয়ন বাজেট অনুমোদন, শিক্ষার্থীদের বিনা বেতনে অধ্যয়ন মঞ্জুরি, শিক্ষার্থীদের স্থান সংকুলান ও স্টাফদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করা, বিভিন্ন ধরনের আর্থিক তহবিল গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণ, ছুটির তালিকা অনুমোদন, শিক্ষকদের নিয়া প্রি-সেশন সম্মেলনের ব্যবস্থা করা, স্কুলের সম্পত্তির কাস্টোডিয়ানের দায়িত্ব পালন ইত্যাদি। কিন্তু এইসব দায়িত্ব তাহারা সুচারুরূপে পালন করেন না। শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই ধরনের অবহেলা ও নানা অনিয়ম বেশি হয়। শিক্ষা বোর্ডগুলির উচিত এই ব্যাপারে তদন্ত সাপেক্ষে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

প্রশ্ন হইল, এইসব কমিটির বিভিন্ন পদে থাকা ব্যক্তিরা নিয়ম মানেন না কেন? সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের তদারকি ও নজরদারির অভাবের কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হইতেছে। দেখা যায়, স্কুলভবন মেরামতের টাকাও সরকার দেয়, দেয় শিক্ষকদের এমপিও। টিআর, জিআর, কাবিখা ইত্যাদি ফান্ড হইতেও তাহারা অর্থ পাইয়া থাকেন। তাহা হইলে স্কুল-কলেজগুলি রুগ্ন থাকিবে কেন? কেন ভবনের পলেস্তারা খসিয়া পড়িবে? কেন লেখাপড়ার মান বাড়িবে না? তদবির, ভর্তি ও শিক্ষক নিয়োগ বাণিজ্য বন্ধ করিয়া এই পর্ষদগুলির জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা দরকার। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪৮ বত্সর পরও কেন শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত হইবে না? স্কুল-কলেজের অনিয়ম অবশ্যই বন্ধ করা দরকার, নতুবা এইসব প্রতিষ্ঠানের সকল দায়দায়িত্ব সরকারের নিয়ন্ত্রণে লওয়াটাই উচিত হইবে।