মাহবুব রনি
দেশে মানহীন জ্বালানি তেল বাজারজাত করছে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বাধ্যবাধকতা থাকলেও পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের মান সনদ গ্রহণ করছে না সংস্থাটি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভেজাল ও নিম্নমানের তেল নিয়ে ভোক্তাদের ভোগান্তি ও অসন্তোষ দীর্ঘদিনের। উত্পাদন, পরিশোধন থেকে শুরু করে পেট্রোল পাম্পে বিক্রি পর্যন্ত নানা পর্যায়ে ভেজাল মেশানোর ঘটনাও পুরোনো। বিপিসি এবং সরকারি বিপণন কোম্পানি, তেল পরিশোধনকারী কোম্পানি এবং পেট্রোল পাম্পের মালিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ নানা পর্যায়ে তেলে ভেজাল মেশানোর সঙ্গে জড়িত। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও উত্তরণে বিভিন্ন সময় মানহীন ও ভেজাল তেলবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে সরকার। কিন্তু এ খাতের নেতৃত্বদানকারী রাষ্ট্রীয় সংস্থাই যদি মান পরীক্ষা না করে তেল বাজারজাত করে সেক্ষেত্রে দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে না।
দেশে ব্যবহূত প্রধান তিনটি জ্বালানি হলো : অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেল। এর মধ্যে চাহিদার চেয়েও বেশি পেট্রোল দেশেই উত্পাদিত হয়। আর অকটেন চাহিদার সবটুকুই মেটানো হয় দেশীয় উত্স থেকে। কিন্তু দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে প্রাপ্ত গ্যাসের উপজাত (কনডেনসেট) পরিশোধন করে পাওয়া এ দুই জ্বালানির একটিও আন্তর্জাতিক ও দেশীয় মানদণ্ডে উত্তীর্ণ নয়। এর ওপর নিম্নমানের এই দুই জ্বালানির পাশাপাশি আমদানিনির্ভর ডিজেলেও খুচরা পর্যায়ে ভেজাল মেশানো হয়। আর এর খেসারত দিচ্ছে গাড়ি ও সেচ পাম্প ব্যবহারকারীরা। ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশের।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) সূত্র জানায়, মানসম্পন্ন জ্বালানি তেল সরবরাহ করা বাধ্যতামূলক। তাই বাজারজাত করার আগেই পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের মান পরীক্ষা করে সনদ নেওয়ার বাধ্যবাধ্যকতা রয়েছে। কিন্তু বিপিসি কখনোই এ মান পরীক্ষা করায়নি এবং সনদ নেয়নি। এ প্রসঙ্গে বিএসটিআইর পরিচালক (মান) মো. সাজ্জাদুল বারী বলেন, দেশে ১৮১টি পণ্য বাজারজাতের আগে গুণগতমানের লাইসেন্স নিতে হবে। এর মধ্যে এই তিনটি জ্বালানি পণ্যও রয়েছে। কিন্তু বিপিসি এগুলো কখনো পরীক্ষার জন্য দেয়নি। বিএসটিআই নিজ থেকে তাদের কাছে চেয়েও তা পায়নি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মানরক্ষা না করলে এবং মান সনদ না নিলে পণ্য বাজারজাত করতে পারে না।
বিএসটিআই এর অপর এক পরিচালক বলেন, মান পরীক্ষা না করে পণ্য বাজারজাত করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু এটি সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় বিএসটিআই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারছে না। তবে কয়েকবার চিঠি চালাচালি হয়েছে। আর জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, বিপিসি নিজেই বুঝতে পারছে- মানদণ্ড রক্ষিত হচ্ছে না। তাই মান পরীক্ষা করতে স্যাম্পল বিএসটিআইকে দিচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. সামছুর রহমান বলেন, বিষয়টি আমার কাছে নতুন। আমি এটি আগে খোঁজ নেইনি। শিগিগরই খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
তেলে ভেজাল মেশানোর পরিস্থিতি এবং প্রতিরোধ বিষয়ে তিনি বলেন, দেশে প্রায় ২ হাজার ১০০টি তেলের পাম্প রয়েছে। গত মাসে ১৩২টি পাম্পে সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করে বিপিসির তদন্ত দল। এর মধ্যে ১২৯টি মানসম্মত অকটেন সরবরাহ করছে। বাকি তিনটি করছে না। আর ১৫-২০টি পাম্প মানসম্মত পেট্রোল বিক্রি করছে না বলে প্রমাণ পেয়েছি। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
দেশে পেট্রোল বাজারজাতকরণে জ্বালানি তেলটির অন্তর্জাত উপাদান অকটেন নাম্বার অন্তত ৮৭ মাত্রায় রাখা বাধ্যতামূলক নির্ধারণ করেছে বিএসটিআই। কিন্তু এটি ৮০ এর বেশি থাকে না বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে চট্টগ্রামের একটি পাম্প থেকে পেট্রোল সংগ্রহ করে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে পরীক্ষা করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। ঐ স্বাধীন পরীক্ষার রিপোর্টে দেখা যায়, সংগ্রহকৃত পেট্রোলে অকটেন নাম্বার ৭৯ দশমিক ২। একইভাবে আদর্শ অকটেন তেলে অকটেন নাম্বার অন্তত ৯৫ থাকতে হবে। কিন্তু ফ্রাকসনেশন প্ল্যান্ট বা পাম্প অথবা অন্য কোনো পর্যায়ে ভেজাল মেশানোর কারণে ঠকছেন ক্রেতারা।
বিপিসির এক কর্মকর্তা জানান, সরকারি খাতের তিনটি ও বেসরকারি খাতের ১৩টি রিফাইনারি (কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্লান্ট) পেট্রোবাংলার কাছ থেকে কনডেনসেট গ্রহণের পর প্রক্রিয়াজাত করে পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল, সলভেন্ট, মোটর স্প্রিট, কেরোসিন সুপিরিয়র অয়েল, মিনারেল তারপেনটাইনসহ বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্য উত্পাদন করে। বেসরকারি পেট্রোল রিফাইনারিগুলোর কয়েকটির বিরুদ্ধে নিম্নমানের পণ্য উত্পাদন, ভেজাল মেশানো এবং অবৈধভাবে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। কয়েকটির কার্যক্রম সরকার স্থগিতও করেছিল। কিন্তু পরে তা উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বেসরকারি প্ল্যান্টগুলো শুধু ফ্রাকসেনেশন (উপজাত থেকে জ্বালানি পণ্য) করছে। কিন্তু নির্দিষ্ট মানদণ্ড রক্ষা করে পরিশোধনের ক্ষমতা এগুলোর নেই। এ জন্য যে আধুনিক প্রযুক্তির মেশিনারিজ ব্যবহার করা দরকার সেগুলো কোনোটিতেই নেই। ফলে নিম্নমানের তেল আসছে বাজারে।
বিপিসি এর এক পরিচালক বলেন, কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে প্রাপ্ত এই পেট্রোল ও অকটেন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে কিছুটা নিম্নমানের। কিন্তু এর সঙ্গে ভেজাল মেশানোয় পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।