চয়ন

মনীষায় দীপ্ত গ্রন্থাবলি আমাদের উজ্জ্বল উদ্ধার

শামসুর রাহমান

 

প্রথমে শিখেছি শুনে, পরে শিখেছি বই পড়ে। এই শেখার পালা আজো শেষ হয়নি। আজো আমার বই-অন্ত প্রাণ। ছোটোবেলায় বইয়ের অক্ষরের চেয়ে ছবির দিকে নজর ছিল বেশি। লুই ক্যারলের অমর সৃষ্টি ছোট্ট মেয়ে অ্যালিস। ছবিহীন বই অ্যালিসের মোটেই পছন্দ হতো না। অ্যালিসের এই মর্জি, বিশ্বাস করি, সকল খোকাখুকির। শিশুরা যখন বড়ো হতে শুরু করে, তখন ছবিময় বইয়ের প্রতি ওদের পক্ষপাত কমে যায়। তাই বলে ছবির প্রতি আকর্ষণ কমে না। বড়ো হয়ে আমরা এমন অনেক বই পড়ি যেগুলো শতকরা এক শ’ ভাগ ছবিহারা। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আগাগোড়া অভিধান পড়তে পছন্দ করেন। একজন চীনা কবির কথা শুনেছি যিনি উইলো বনে শুয়ে শুয়ে বিভোর হয়ে পড়তেন অভিধান। অভিধানে তো সাধারণত একটিও ছবি থাকে না, যদিও অগুনতি শব্দের ভেতরে লুকিয়ে থাকে ছবি। তবে কোনো কোনো শব্দার্থ পাঠকের কাছে স্পষ্ট করে তোলার জন্য কোনো কোনো অভিধানে খুদে ছবি থাকে।

বই পড়ার অভ্যাস চটজলদি গড়ে ওঠে না। বইয়ের প্রতি আকর্ষণ বাড়ে আস্তে আস্তে নানা ধরনের বইয়ের সংস্পর্শে এসে। তারপর বই সংগ্রহের ঝোঁক হয়। লাইব্রেরিতে ভালো একটি বই দেখলে সেটি কিনতে ইচ্ছে হয়, রাখতে ইচ্ছে হয় নিজের কাছে। এভাবেই উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে পুস্তকপ্রীতি। এই পুস্তকপ্রীতির ফলে গড়ে ওঠে প্রবাল দ্বীপের মতো ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার। পুস্তকপ্রীতি যাঁর গাঢ়, তিনি বইয়ের মধ্যে থাকতে ভালোবাসেন। তাঁর চারপাশে বই না থাকলে তিনি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন না। পুস্তকপ্রেমীর শোবার ঘরেও থাকে সারি সারি বই। কারো কারো টেবিল, বুক শেলফ উপচে পড়ে বই।

ছাত্রজীবনে বই সংগ্রহে মন দিই। অনেক আগে মাহুত্টুলীতে একটি বাড়িতে লাইব্রেরি ছিল। এই লাইব্রেরি পরিচালনা করতেন একজন দেশি খ্রিস্টান। বাইরের লোকজনও লাইব্রেরি ব্যবহার করত। আমারও প্রবেশাধিকার ছিল সেখানে। মনে পড়ে, সেই শীতল ছায়াচ্ছন্ন গ্রন্থাগারে বসে পুরনো প্রবাসী এবং ভারতবর্ষ পত্রিকার বাঁধানো সেট নাড়াচাড়া করেছি, পড়েছি নিবিষ্ট চিত্তে। পরে পাটুয়াটুলির রামমোহন লাইব্রেরির সদস্য হই। এভাবেই আমার পর্যটন চলতে থাকে গ্রন্থের ভুবনে। সেকালে সদরঘাটে বৃন্দাবন ধর অ্যান্ড সন্স নামে একটি বইয়ের দোকান ছিল। বৃন্দাবন ধর সম্ভবত একদা পোগোজ স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন। এই লাইব্রেরি থেকেই মোহিতলাল মজুমদারের কাব্যগ্রন্থ বিস্মরণ, কাজী নজরুল ইসলামের অগ্নিবীণা, বুদ্ধদেব বসুর বন্দীর বন্দনা এবং প্রেমেন্দ্র মিত্রের প্রথমা কিনি। বৃন্দাবন ধর অ্যান্ড সন্স, বলা যেতে পারে, সর্বপ্রথম আমাকে আধুনিক বাংলা কবিতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।

যা হোক, বহুকাল আগে আমার ব্যক্তিগত লাইব্রেরির গোড়াপত্তন হয় মাত্র তিন-চারটি বই দিয়ে। আজ আমার নিজস্ব গ্রন্থাগারের গ্রন্থসংখ্যা খুব বেশি না হলেও নেহাত্ কমও নয়। কারো কারো নজর কেড়েছে আমার লাইব্রেরি। কেউ তারিফ করুক আর না-ই করুক, এই গ্রন্থাগার আমার মস্ত সহায়, জীবন-ধারণের অবলম্বন। গ্রন্থহীন জীবন আমি কল্পনা করতে পারি না। রোজ কিছু না কিছু আমাকে পড়তেই হয়। যদি দু’চারদিন বই স্পর্শ না করি, তাহলে মনে হয়, অসভ্য হয়ে যাচ্ছি। সভ্যতার সঙ্গে গ্রন্থের একটি অবিচ্ছেদ্য সংযোগ রয়েছে। যে রেনেসাঁসের কথা আমরা এত বলি, তা কি সম্ভব হতো যদি অতীতে ভাবুক এবং মনীষীগণ গ্রন্থ রচনা না করতেন? আমি এখানে ইউরোপীয় রেনেসাঁসের কথা বলছি। সভ্যতার ক্রমবিকাশে পুঁথির বিরাট ভূমিকা রয়েছে, একথা অস্বীকার করবে কে?     (অংশবিশেষ)

সূত্র: সেরা শামসুর রাহমান/সম্পাদনা: সালেহ চৌধুরী (সময়, ২০০৪)