সম্মিলনে বক্তারা
ইত্তেফাক রিপোর্ট
‘আমরা সেবক বা দাসী হয়ে থাকতে চাই না; আমরা মানুষের মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চাই। নানা বৈষম্যের কারণে আমাদের শিশুদের স্কুল থেকে ঝরে পড়তে হয়। আমরা সময়মতো সব চিকিত্সাসেবা পাই না। আমাদের কলোনিতে লেখা থাকে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বাসস্থান। আমরা লেখাপড়া শিখে ভাগ্য বদলের লড়াইয়ে নেমেছি। সেখানে যদি আবার আমাদের পরিচ্ছন্নতাকর্মী কিংবা অস্পৃশ্য বলে সমাজ থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়, তাহলে তো আমরা কখনোই সমাজের মূলধারার একজন হয়ে উঠতে পারব না’—কথাগুলো বলছিলেন দলিত নারীদের সম্মিলন ও মিলনমেলায় অংশ নেওয়া দলিত নারীরা। গতকাল ধানমন্ডিস্থ উইমেন্স ভলান্টারি অ্যাসোসিয়েশন (ডব্লিউভিএ), মিলনায়তনে আয়োজিত সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। আলোচনা সভার আগে ঢোল ও ত্রিশুল হাতে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় অংশ নেন তারা। এতে সারাদেশ থেকে আসা দলিত নারীরা অংশগ্রহণ করেন। দলিত নারীর মানবাধিকার উন্নয়ন এবং জাতীয় পর্যায়ে দলিত নারীদের আরো সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ দলিত নারী ফেডারেশন ও দলিত নারী ফোরাম যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করে। সম্মেলনে স্লোগান ছিল ‘আমাদের সংগ্রাম, আমাদের মর্যাদা, আমাদের মুক্তি’।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য আরোমা দত্ত বলেন, বর্তমান সরকার নারীবান্ধব দলিতদের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে হবে, যেহেতু তারা পুরোনো পেশা ছেড়ে বের হয়ে এসেছে। দলিতদের উদ্দেশ্যে আরোমা দত্ত আরো বলেন, আপনারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট দলিত জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের বিষয়ে আবেদন জানালে তিনি অবশ্যই সাড়া দেবেন বলে আশা রাখি। সংহতি জানিয়ে আমন্ত্রিত অতিথিরা বলেন, ১০ বছর পূর্বে বাংলাদেশে দলিত জনগোষ্ঠীর মানবাধিকারের বিষয়টি সেভাবে আলোচিত না হলেও বর্তমানে দলিত জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকার এবং বেশ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী দলিত জনগোষ্ঠীর জন্য পরিচ্ছন্নতাকর্মে শতকরা ৮০ ভাগ কোটা বরাদ্দসহ তাদের আবাসন, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। বক্তারা আরো বলেন, পরিবার হচ্ছে দলিত নারীর উন্নয়নের পথে বড়ো বাধা। এই বাধা দূর করে দলিত নারীর উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হলে প্রয়োজন সচেতনতা এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তন। এছাড়া দলিত পিতামাতাদের তাদের সন্তানদের বাল্যবিবাহ না দিয়ে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার আহ্বান জানান উদ্যোক্তারা।
আলোচনা সভায় সংহতি প্রকাশ করে আরো বক্তব্য রাখেন—নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, সিনিয়র সহকারী জেলা জজ ও জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার মো আলমগীর হোসেন, গবেষক ও নৃবিজ্ঞানী রাবেয়া রওশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের শিক্ষক সোহানা আহমেদ, শরীয়তপুর ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির পরিচালক রাবেয়া বেগম, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এর উপপরিচালক মাহবুবা আখতার প্রমুখ। মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন দলিত নারী ফোরামের ফিল্ড কোঅর্ডিনেটর তামান্না সিং বাড়াইক। সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন দলিত নারী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মনি রানী দাস। জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং দলিত আন্দোলনের প্রয়াত নেতৃবৃন্দের প্রতি সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যে প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে সম্মেলনের কার্যক্রম শুরু হয়।