ষড়যন্ত্রকারীদের খুঁজে বের করা হবে

দুয়ারে ভারত সফর। আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হিসেবে দুটি টেস্ট ও তিনটি টি-টোয়েন্টি খেলতে আগামী ৩০ অক্টোবর দুপুরে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের দেশত্যাগের সূচিও চূড়ান্ত। সীমান্তের ওপারে কলকাতার ইডেন গার্ডেনে সাদা পোশাকে সাকিব-কোহলিদের লড়াই দেখতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নব্য সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলি।

ভারত সফরের প্রাক্কালে হুট করেই ১১ দফা দাবিতে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের নজিরবিহীন ধর্মঘট নাড়িয়ে দিল ক্রিকেটাঙ্গন। আকস্মিক ধর্মঘটে বিস্মিত বিসিবি। গুরুত্বপূর্ণ ভারত সফরের আগে ক্রিকেটারদের এই কর্মকাণ্ডকে দেশের ক্রিকেটের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলেই মনে করেন বিসিবির সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন।

গত সোমবার বিসিবি একাডেমি মাঠে ১১ দফা দাবি জানিয়েছিলেন সাকিব-মুশফিকরা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ক্রিকেটের সব ধরনের কার্যক্রম বয়কট করেছেন তারা। এর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল মিরপুর স্টেডিয়ামের বিসিবি কার্যালয়ে জরুরি সভা করেছেন বিসিবির পরিচালকেরা। প্রায় দুই ঘণ্টা সভার পর সংবাদ সম্মেলন করে বিসিবি। জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনও স্থায়ী হয়েছে দেড় ঘণ্টা, যেখানে এ বিষয়ে বিসিবির কঠোর অবস্থান          স্পষ্ট হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বিসিবির সভাপতি জানিয়েছেন, ক্রিকেটাররা সরাসরি বিসিবিকে না জানিয়ে সংবাদমাধ্যমে দাবির কথা বলায় হতবাক তারা। ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ সফরের আগে ধর্মঘটের মাধ্যমে দেশের ক্রিকেটকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত হচ্ছে। পুরোটাই ষড়যন্ত্রের অংশ এবং ষড়যন্ত্রকারীদের খুঁজে বের করা হবে বলে জানিয়েছেন বিসিবির সভাপতি। তিনি বলেছেন, ক্রিকেটাররা বিসিবির কাছে এলেই দাবি মেনে নিত। তাদের অনেক দাবিই প্রক্রিয়াধীন আছে।

বিসিবির সভাপতি বলেন, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেটকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে। ওরা এখন চায়, ভারত সফরে যদি না যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। এটা ষড়যন্ত্রের অংশ। কিছুদিনের জন্য সময় চাইছি। সবকিছু প্রকাশ করা হবে।’

ক্রিকেটাররা তাদের উদ্দেশ্যে সফল উল্লেখ করে নাজমুল হাসান পাপন বলেছেন, ‘খেলোয়াড়েরা এ পর্যন্ত সফল। দেশের ক্রিকেটের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে সফল হয়েছে। ওরা কথা বলার কোনো সুযোগই রাখেনি। সবই পরিকল্পনার অংশ। সবাই জেনেশুনে অংশ নিয়েছে বলে মনে হয় না। এটা আমাদের খুঁজে বের করা দরকার।’

ক্রিকেটাররা দাবি নিয়ে কেন বিসিবির কাছে যাননি প্রশ্ন করে বিসিবির সভাপতি বলেছেন, ‘ওরা তো চাইলেই পাবে, আসেনি কেন? আমাদের কাছে চাচ্ছে না কেন? ফোন ধরছে না। সবকিছুর পেছনে কারণ আছে। আমাদের কাছে না গিয়ে মিডিয়ায় বলেছে, সেটির পেছনে বিশেষ কারণ আছে। আমাদের সুযোগ না দিয়ে মিডিয়ায় গেছে। এটি বিশেষ একটি পরিকল্পনার অংশ। পরিকল্পিতভাবে করা হচ্ছে।’

পাপনের আশা, ভারত সফর হবে

দুই দিন পরই শুরু হবে ভারত সফরের ক্যাম্প। এমন সময়ে ক্রিকেটাররা ধর্মঘটে। তারপরও বিসিবির সভাপতির আশা, ভারত সফর হবে। নির্ধারিত সময়েই (২৫ অক্টোবর) শুরু হবে ক্যাম্প। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে নাজমুল হাসান পাপন বলেছেন, ‘আমি অবশ্যই আশা করি ক্যাম্প চলবে। ভারত সিরিজ হবে। কারণ আমার এখনো বিশ্বাস, বেশির ভাগ খেলোয়াড়ই খেলতে চায়। তারা ক্রিকেটের উন্নয়ন চায়। কয়েকটা টাকা, ৫ হাজার টাকার জন্য দেশের ক্রিকেটের সর্বনাশ করে দেবে, এটা আমার বিশ্বাস হয় না। তবে সামনেই তো দেখতে পাব সব।’

সাড়া মিলছে না ক্রিকেটারদের

ক্রিকেটারদের ১১ দফা দাবি নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিসিবি। গতকাল প্রতিক্রিয়া জানাতে যোগাযোগ করা হলে, বেশির ভাগ ক্রিকেটারই ফোন ধরেননি। অনেকে মুঠোফোনই বন্ধ করে রেখেছেন। বিসিবির বক্তব্যের পর ক্রিকেটারদের অবস্থান তাই স্পষ্ট হয়নি। এখন কী করবেন ক্রিকেটাররা সেটি জানা যায়নি। পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তার বিষয়ে সাড়া মিলেনি ক্রিকেটারদের। সাকিব, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহরা ফোনই ধরেননি।

গতকাল রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তই হয়নি ক্রিকেটারদের। বিসিবির কাছে গিয়ে দাবি উপস্থাপনের বিষয়ে মুখ খুলছেন না তারা।

পরিস্থিতি বলছে, ক্রিকেটাররা অনেকটাই হয়তো দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। যারা গত সোমবার সংবাদ সম্মেলনে ছিলেন, তারা এখনো ভবিষ্যত্ করণীয় কী তার নির্দেশ পাননি শীর্ষ ক্রিকেটারদের কাছ থেকে। এমনকি অনেককে ফোন না ধরার কথা বলা হয়েছে। আবার যারা সেদিন উপস্থিত ছিলেন না, তারা এ কার্যক্রমে নিজের সম্পৃক্ততাই অস্বীকার করছেন।

গতকাল সন্ধ্যার পর ক্রিকেটারদের অবস্থান জানতে চাইলে তামিম ইকবাল বলেছেন, আমি এখনো জানি না কী হবে। আমি তো একা নই। এটা সবার সিদ্ধান্ত। আমি একা তো কিছু বলতে পারি না। যা হবে সবাই মিলে আপনাদের জানাবে।

ইমরুল কায়েস বলেছেন, এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। হয়তো কাল (আজ) একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত হতে পারে। সময় হলে সবকিছু আপনাদের জানানো হবে। 

অভিজ্ঞ ক্রিকেটার তুষার ইমরান কয়েক বছর আগেও ক্রিকেটারদের দাবিদাওয়াতে সোচ্চার ছিলেন। মিডিয়ায় কথা বলেছেন। গতকাল নীরবতা দেখা গেল তার মাঝে। গতকাল তুষার জানিয়েছেন, ‘ভাই আমি তো কিছুই জানি না। আমি ঢাকায় যাইনি। আমি তো ঐ দিন ওখানে ছিলাম না’।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তরুণ ক্রিকেটার গতকাল বলেছেন, এখনো তো কিছু জানি না। আমাদের কিছুই জানানো হয়নি। হয়তো সবাই মিলে বসবে। তারপর ঠিক হবে, কী করা যায়।

সাকিবদের পাশে ফিকা

ধর্মঘটের ডাক দেওয়া বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের পাশে দাঁড়িয়েছে ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ফিকা। সংহতির ঘোষণা দিয়ে এক বিবৃতিতে গতকাল ফিকা জানিয়েছে, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা তাদের সংহতির জন্য এবং পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে ন্যায্য অবস্থা নিশ্চিত করতে যে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়েছে তার জন্য সাধুবাদ জানাচ্ছে ফিকা, আমরা যেটাকে গুরুত্বপূর্ণ একটা ক্রিকেট দেশ হিসেবে বিবেচনা করি সেখানে খেলোয়াড়দের যেভাবে মূল্যায়ন করা হয় এবং এর প্রেক্ষিতে যে পরিবর্তন প্রয়োজন এটা তার পরিষ্কার ইঙ্গিত।     

ক্রিকেটারদের পাশে না থাকায় কোয়াবের কড়া সমালোচনা করেছে ফিকা। তারা বলেছে, ‘এটা খেলোয়াড়দের সংগঠনের দায়িত্ব যে, এ ব্যাপারে আওয়াজ তুলবে। ক্রিকেটারদের সংকটের সময় ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব) তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না—এটা আমাদের কাছে উদ্বেগের। আরো বড়ো উদ্বেগের বিষয় এই যে, কোয়াবের কর্মকর্তারা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে বিভিন্ন পদে আছেন।’