কম্বোডিয়ার ক্ষমতাসীনরা যেভাবে বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন

তিন দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় আছেন কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেন। ৬৭ বছর বয়সি হুন সেনই বিশ্বে সবচেয়ে দীর্ঘসময় শাসন করা ব্যক্তি। তিনি বিরোধী রাজনীতিকদের কারাগারে ঢুকিয়েছেন বা বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন। অনেক মিডিয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। আর রাস্তা-ঘাটে সমাবেশ একরকম নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। তার মতে, ক্ষমতাসীনরা দেশপ্রেমিক। তারা বিদেশে অর্থ পাচার করেন না। কিন্তু বার্তা সংস্থা রয়টার্সের অনুসন্ধানে তার পরিবার এবং সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের অর্থ পাচার ও সম্পদ গড়ে তোলার তথ্য পাওয়া গেছে। কেউ কেউ আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকত্বও নিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর ভাইঝি হুন কিমলেং। তার সেন্ট্রাল লন্ডনে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। এটা ডিউক অ্যান্ড ডাচেস অব ক্যাম্ব্রিজের রাজপ্রাসাদ থেকে কয়েকশ’ মিটার দূরে অবস্থিত। ২০১০ সালে হুন কিমলেং ২৫ লাখ ডলার দিয়ে অ্যাপার্টমেন্টটি কিনেন। এর আর্থিক মূল্য বর্তমানে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সম্পত্তির সরকারি রেকর্ড থেকে এই তথ্য জানা গেছে। সিঙ্গাপুর ভূমি কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, হুন কিমলেংর সিঙ্গাপুরে কয়েক মিলিয়ন ডলারে কেনা আরো একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট আছে। হুন কিমলেং সাইপ্রাসের নাগরিক। অথচ হুন সেন প্রায়ই তার রাজনৈতিক বিরোধীদের দুটি পাসপোর্ট নিয়ে সমালোচনা করে থাকেন। তার ভাইঝির নাগরিকত্বের বিষয়টি সাইপ্রাসের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে। সাইপ্রাস ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ায় তিনি এই অঞ্চলের যে কোনো দেশে ভিসা ছাড়াই বসবাস করতে পারবেন। সাইপ্রাসের নাগরিক হওয়াটা সহজ নয়। এজন্য সেখানে অন্তত ২২ লাখ ডলারের বিনিয়োগ করতে হয়। সাইপ্রাসের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০১৭ সালের ২১ নভেম্বর হুন কিমলেং নাগরিকত্ব পেয়েছেন। এছাড়া তার স্বামী নেথ সাভোয়েউন ও তাদের দুই প্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানের নাগরিকত্বের বিষয়েও মন্ত্রণালয় সুপারিশ করেছে। ক্যাবিনেটও এই সুপারিশ গ্রহণ করেছে।

নেথ সাভোয়েউন দেশের পুলিশ প্রধান। রাজনৈতিক বিরোধীদের গ্রেফতারে এবং সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেন। গত বছর মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তার নাম ১২ জেনারেলের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন যারা কর্তৃত্বপরায়ণ সরকার গঠনে ভূমিকা রেখেছেন। নেথ সাভোয়েউন ক্ষমতাসীন কম্বোডিয়ান পিপলস পার্টিরও সিনিয়র সদস্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষক এম সোভান্নারা বলেন, দেশের শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাই বিদেশে নাগরিকত্ব নিয়েছেন। এর মাধ্যমে প্রমাণ হচ্ছে যে, তারা একে অপরের প্রতি আস্থা হারাচ্ছেন। গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ক্ষতি করায় ২০১৭ সালে নেথ সাভোয়েউন, হুন কিমলেং এবং তার তিন সন্তানকে কালো তালিকাভুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র। সাইপ্রাসের আইন অনুযায়ী, মেয়েরাও নাগরিকত্ব পেতে পারেন যদি আর্থিকভাবে প্রাথমিক আবেদনকারীর ওপর তারা নির্ভরশীল থাকেন। তবে হুন কিমলেংয়ের এক সন্তান ভিচুনা নেথ (২৬) নিজেই আত্মনির্ভরশীল এবং সম্পদশালী। তিনি ২০১৭ সালে লন্ডনে তার মায়ের অ্যাপার্টমেন্টের কাছে একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট কেনেন।

হুন সেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী অর্থমন্ত্রী আউন পর্নমোনিরথও সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব পেয়েছেন বা আবেদন করেছেন। এমনকি অর্থমন্ত্রীর স্ত্রীও আবেদন করেছেন। হুন সেনের ঘনিষ্ঠ চোইউং সোপহি এবং তার স্বামী লাউ মিং ক্যানও একজন ধনকুবের হিসেবে পরিচিত। তাদের ব্যবসায় অবৈধ কর্মকাণ্ডেরও অভিযোগ আছে। তারা প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্কে আবদ্ধ। স্থানীয় মিডিয়ার তথ্যমতে, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গেও তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তারা সেনা, পুলিশ এবং এবং হুন সেনের নিরাপত্তারক্ষীকে প্রচুর অর্থ ও উপহার দিয়ে থাকেন। তাদেরও সাইপ্রাসের পাসপোর্ট রয়েছে। ২০১৭ সালে তাদের পাঁচ সন্তানের চার জন সাইপ্রাসের পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। ওই সময় হুন সেনের ক্ষমতা নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল।

হুন সেনের দল নির্বাচনে সবসময়ই প্রভাব বজায় রেখেছে। কিন্তু ২১০৩ সালে তার দল খারাপ ফল করে। কম্বোডিয়ান পিপলস পার্টি ২০১৩ সালের নির্বাচনে ১২৩ টি আসনের মধ্যে মাত্র ৬৮ টি আসনে জয় পায় এবং ভোট পায় ৪৮ ভাগ। ১৫ বছরে এটা ছিল হুন সেনের জন্য খারাপ ফলাফল। এরপর নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ রাস্তায় বিক্ষোভ শুরু হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনী সেখানে হস্তক্ষেপ করে। এতে অনেকে হতাহত হয়। বিরোধী নেতাকে জোরপূর্বক বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং তার উত্তরসূরীকে গৃহবন্দি করা হয়। বিরোধী দল ভেঙে দেওয়া হয়। এমনকি সমালোচকদেরও গ্রেফতার ও অভিযুক্ত করা হয়। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে এক সমালোচককে দিনে দুপুরে হত্যা করা হয়। পুলিশ জানায়, ওই ব্যক্তি ঋণ নিয়েছিলেন এবং যার কাছ থেকে নিয়েছিলেন তিনিই হত্যা করেছেন। এক ব্যক্তি সেটা স্বীকার করেন এবং যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে হুন সেন ৭৭ ভাগ ভোট পান এবং প্রত্যেকটি একক আসনে জয় পান।

প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের সাধারণ জীবন-যাপনের সঙ্গে তার সহযোগী বা ঘনিষ্ঠদের জীবন-যাপনের মিল নেই। গত ফেব্রুয়ারিতে একটি কারখানায় গিয়ে হুন সেন বলেছিলেন, দ্বিতীয় দেশের কোনো নাগরিকত্ব তার নেই। এমনকি বিদেশে কোনো বাড়িও নেই। বিদেশে থাকার চেয়ে তিনি দেশের মানুষের সঙ্গে ঘাস খেতেও রাজি। অথচ সেই কম্বোডিয়ায় সম্পদ ও বিলাসিতা আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) জানিয়েছেন, দেশটিতে ৭৯ ভাগ মানুষ ৩ ডলার আয়ের ওপর বেঁচে থাকেন। প্রধানমন্ত্রীর এক ভাইঝির সন্তান হুন পানহাবোত তার গার্লফ্রেন্ডকে জন্মদিনে মার্সিডিজ বেঞ্চ উপহার দেন। ফেসবুকে একটি পোস্ট থেকে এই তথ্য জানা যায়। তার মতে, এই উপহার প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তিকে কোনোভাবেই ক্ষুন্ন করে না।

রয়টার্সের প্রতিবেদন সম্পর্কে হুন সেনের সরকার কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। এমনকি তার আত্মীয় এবং সহযোগীরাও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।