শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ কাজ শুরু
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের বিনিময়ে সংগৃহীত বিমানের উড্ডয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে সবাইকে বিশেষ যত্নবান হতে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, পেশাগত দক্ষতা ও সততার কোনো বিকল্প নেই। আর দেশের মান-মর্যাদাও এর সঙ্গে জড়িত। আর বিমান উড্ডয়ন একটি উচ্চতর কারিগরি পেশা। এখানে পেশাগত দক্ষতার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এ দক্ষতা একদিকে যেমন আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে, তেমনি সংশ্লিষ্ট সংস্থার জন্যও বয়ে আনে সুনাম ও মর্যাদা। আমরা বিশ্বের সঙ্গে আকাশ পথে যোগাযোগ স্থাপন করতে চাই। তাই কষ্টার্জিত অর্থের বিনিময়ে সংগৃহীত এই মূল্যবান বিমানের নিরাপদ উড্ডয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে সকলকে যত্নবান হতে হবে।
গতকাল বুধবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে তিন দিনব্যাপী ৬ষ্ঠ ‘আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সেফটি’ সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বিমান ভ্রমণ আরো নিরাপদ, আরামদায়ক ও সহজতর করতে আমরা বদ্ধপরিকর। এর অংশ হিসেবে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। শাহজালালে নতুন টার্মিনাল হওয়ার পর এখনকার চেয়ে প্রায় আড়াইগুণ বেশি অর্থাত্ বছরে প্রায় ১২০ কোটি যাত্রীকে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
তার সরকারের এভিয়েশন সেক্টরের মানোন্নয়নে গৃহীত বিশেষ পদক্ষেপের ফলে এ অঞ্চলের বিমান বাহিনী এবং বেসামরিক বিমানের ফ্লাইট সেফটি রেকর্ড অত্যন্ত সন্তোষজনক উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সরকার এভিয়েশন সেক্টরের মান উন্নয়নের জন্য বিশেষ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। ফলে এ অঞ্চলে আমাদের বিমান বাহিনী ও বেসামরিক বিমানের ফ্লাইট সেফটি রেকর্ড অত্যন্ত সন্তোষজনক। শেখ হাসিনা বলেন, সম্প্রতি আমাদের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (আইসিএও) এর ফ্লাইট সেফটি সমীক্ষায় ঈর্ষণীয় ৭৫ দশমিক ৪৬ ভাগ নম্বর অর্জন করেছে, যা এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সম্প্র্রতি নিরাপদ উড্ডয়নের মানদণ্ডে পাঁচ তারকার আন্তর্জাতিক মান অর্জন করেছে এবং আন্তর্জাতিক এভিয়েশন সেফটি অ্যাসেসমেন্ট প্রোগ্রামের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অথোরিটির টেকনিক্যাল রিভিউয়ে ক্যাটাগরি-১ ঘোষণা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কথা মাথায় রেখেই বিমানবন্দরগুলোকে উন্নত করতে চাই। এছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে অধিকতর যোগাযোগ স্থাপন করার জন্য সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নীত করার পরিকল্পনাও আমরা হাতে নিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, নেপাল ও ভুটানসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলো ও লাগোয়া ভারতের প্রদেশগুলোর ব্যবহারের জন্য সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে ‘আঞ্চলিক বিমানবন্দর’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। ইতিমধ্যে আমরা তার কার্যক্রম শুরু করেছি। এটা আন্তর্জাতিকমানের একটি বিমানবন্দরে উন্নীত হবে। এ সময় কক্সবাজার বিমান বন্দরের রানওয়ে ১২ হাজার ফুটে বর্ধিতকরণসহ সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তরের উদ্যোগ, বাগেরহাটে খান জাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ এবং বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলমান আছে বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে তার সরকার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ আইন-২০১৭ প্রণয়ন করেছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত পৌনে ১১ বছরে বিমানবহরে আমরা বোয়িং কোম্পানির চারটি অত্যাধুনিক ড্রিমলাইনারসহ মোট ১০টি বিমান যুক্ত করেছি। অত্যাধুনিক এই উড়োজাহাজগুলো দিয়ে তার সরকার নিউ ইয়র্ক, টরোন্টো ও সিডনির মতো দূরবর্তী গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করতে আগ্রহী উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই লক্ষ্যে সিভিল এভিয়েশন অথরিটিকে ক্যাটাগরি-১ এ উন্নীতকরণের কাজ এগিয়ে চলেছে। তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে উন্নত যুদ্ধবিমান, র্যাডার এবং অন্যান্য সরঞ্জাম ক্রয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে একটি শক্তিশালী বিমান বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা এবং বাংলাদেশ বিমানকে আধুনিকীকরণের জন্য আমাদের সরকার প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের যৌথ ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এই সেমিনারের এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘টিম এফোর্ট ক্যান ইনশিউর টিম সেফটি।’ যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, চীন, মালয়েশিয়া, ভারত, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়ার, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ফিলিপাইন, সৌদি আরব, মিশর, ওমান, মরক্কো, নাইজেরিয়া, জিম্বাবুয়ে এবং বাংলাদেশসহ চারটি মহাদেশের ১৬টি দেশের বিমান বাহিনীর সদস্য ও আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অথোরিটির (আইসিএও) প্রতিনিধিরা এবারের সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন। বিগত দুই দিন এখানে বিমান দুর্ঘটনা প্রতিরোধ প্রক্রিয়ার উন্নয়নে দেশি-বিদেশি সামরিক-অসামরিক সব সংস্থার মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পাশাপাশি নিরাপদ উড্ডয়ন সংক্রান্ত নতুন নতুন ধারণা নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত, বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশন অথরিটির চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মুহাম্মদ মাফিদুর রহমান এবং ফ্লাইট সেফটি বিভাগের পরিচালক এয়ার কমোডর মোহাম্মাদ মোস্তাফিজুর রহমান বক্তৃতা করেন। সেমিনারে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সনদ বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন বিমান বাহিনী প্রধান। বেসামরিক বিমান পরিবহন এবং পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী এ সময় উপস্থিত ছিলেন।