৯/১১-উত্তর বিশ্বে সকল বন্দরের—তাহা হউক নৌ, স্থল কিংবা বিমান—নিরাপত্তাব্যবস্থা অতি স্পর্শকাতর একটি বিষয়। টুইন টাওয়ার হামলার অব্যবহিত পরে দেশে দেশে বন্দরগুলির নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করা হয়। জাতিসংঘের অধীন আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থা বিভিন্ন বন্দরের নিরাপত্তাসংক্রান্ত ব্যবস্থা বা আইএসপিএস কোড (জাহাজ ও বন্দর স্থাপনার নিরাপত্তাঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম) প্রণয়ন করে। জাহাজ বা কনটেইনারে বিপজ্জনক পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে যাহাতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা না হয়, সেই জন্যই এই নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৪৮টি দেশের বন্দরে তাহা বাস্তবায়িত হইয়াছে। পাশাপাশি আমাদের দেশের সরকারও দেশের বন্দরগুলোর বিশেষ করিয়া চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা ও কারিগরি নানা দিক উন্নতিকল্পে বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করিয়াছে। ইহার ইতিবাচক ফলও মিলিয়াছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরে নানা ধরনের অবৈধ চালান আটক হইয়াছে উল্লেখজনক হারে। যেমন, আটক হইয়াছে কনটেইনারভর্তি বালু। অন্য একটি পণ্যের নামে ইহা আমদানি করা হইতেছিল। আমদানি পণ্যের কায়িক পরীক্ষা করিতে গিয়া এই ঘটনা ধরা পড়িলে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ চালানটি আটকাইয়া দেয়। ধারণা করা হইতেছে, মুদ্রা পাচারের জন্যই এক পণ্যের নামে অন্য পণ্য আমদানি করা হইয়াছে। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কাস্টম কর্তৃপক্ষের এমন সাফল্য নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। তাহারা তাহাদের কর্মে, দায়িত্ব পালনে সফলতা অর্জনের মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য হইয়া উঠিতেছেন। তাহাদের এই সাফল্য আমাদের জন্য স্বস্তিদায়ক। ঐ অবৈধ চালানটি একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান চীন থেকে আমদানি করে। ৩০ লক্ষ টাকা মূল্যের চালানে ২০ টন বালু আসিয়াছে। চালানটির বিপরীতে ৫ শতাংশ হারে ১ লক্ষ ৫৭ হাজার টাকা শুল্ক পরিশোধ করা হয়। কাস্টমস সূত্র জানায়, চালানের নমুনা পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হইবে। উহা যদি সাধারণ বালু না হইয়া সিলিকা বালু হয় তাহা হইলে শুল্ক দিতে হইবে ২০ শতাংশ। এই ক্ষেত্রে শুল্ক ফাঁকির মামলা হইবে। অন্যথায় অর্থ পাচার বলিয়া গণ্য হইবে এবং মানি লন্ডারিং আইনে মামলা হইবে।
আমাদের কাস্টমস কর্তৃপক্ষের এহেন সফলতা ও সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের পরেও বলিতে হয় চট্টগ্রাম বন্দরের নানা সীমাবদ্ধতা এখনো বিদ্যমান। ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি দূর করিতে ১৬ দফা নির্দেশনা দিয়াছিল যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ডের একটি প্রতিনিধিদল। জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থার পক্ষে এইসব নির্দেশনা দেওয়া হইলেও এখনো তাহা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয় নাই। ১৬ দফার মধ্যে মানুষ ও যানবাহন আসা-যাওয়ার ফটকে উন্নত মানের নিরাপত্তাব্যবস্থা স্থাপনসহ কয়েকটি নির্দেশনা বাস্তবায়নে বেশ অগ্রগতি হইয়াছে বটে, তবে কাজ পুরোপুরি শেষ করা যায় নাই। সমগ্র বন্দর এলাকা সিসিটিভির আওতায় আনার নির্দেশনা দেওয়া হইলেও তাহা এখনো হয় নাই। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার বন্দরগুলো নিরাপদ ও কারিগরি দিক দিয়া উন্নত করিতে অসমাপ্ত কাজগুলো দ্রুত শেষ করিবে। কারণ যুগোপযোগী বন্দর ব্যবস্থার উপর দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকাংশে নির্ভরশীল।