আত্মহত্যা প্রতিরোধ নিয়ে কিছু কথা

তীব্র কষ্ট, হতাশা ও বিভিন্ন ধরনের ক্ষতির অভিজ্ঞতা এবং জিনগত, মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণসহ অন্যান্য নেতিবাচক উপাদানের সম্মিলিত ফল আত্মহত্যা। যেসব ব্যক্তি তাদের জীবনে এ ধরনের জটিল ও সমন্বিত সমস্যার মুখোমুখি হন, তাদের আচরণের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী—প্রতি বছর বিশ্বে আত্মহত্যা করছে প্রায় ৮ লাখ মানুষ। হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতি ৪০ সেকেন্ডে ঝরছে একটি করে প্রাণ। দুনিয়ার যে কোনো অঞ্চলের যে কোনো বয়সের মানুষই হতে পারেন আত্মহত্যার শিকার। বিশেষ করে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি নারী-পুরুষ মৃত্যুর দ্বিতীয় বৃহত্তম কারণ এই আত্মহত্যা। আশার কথা হলো—এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব।

নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কারণগুলো তাই সবার আগে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। যেসব কারণে মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, তার অন্যতম বুলিং। চরম অপমান, হতাশা ও অসহায়ত্ব বোধ থেকে কিশোর-কিশোরীদের এই পথে পা বাড়াতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে বেঁচে থাকার কোনো কারণ খুঁজে পায় না সে। মাদকাসক্তির মতো সমাজবিরোধী আচরণও অনেক সময় আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি করে। বাংলাদেশে আরো যেসব সামাজিক ও পারিবারিক কারণে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যায়, সেগুলো হলো—যৌতুক প্রথা, নির্যাতনের শিকার, চাওয়া-পাওয়ার বৈপরীত্য, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, বাবা-মায়ের মধ্যে সুসম্পর্কের ঘাটতি, সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের অবহেলা, প্রেমে ব্যর্থ হওয়া, পরকীয়া, দীর্ঘদিনের বেকারত্ব, চাকরি হারানো, প্রতারণার শিকার হওয়া, দরিদ্রতা, ব্যবসায় বড়ো ধরনের ক্ষতি, পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিক, ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ববোধের অভাব, প্রিয়জনের মৃত্যু, সাইবার ক্রাইমের শিকার হওয়া ইত্যাদি। এছাড়া বিষণ্নতাসহ গুরুতর কিছু মানসিক অসুস্থতা আত্মহত্যার অন্যতম কারণ হতে পারে।

আত্মহত্যার কিছু সতর্ক সংকেত রয়েছে, যাকে বলা হয় রেড ফ্ল্যাগ; যা দেখে আপনি বুঝতে পারবেন যে, আপনার প্রিয়জন বা কাছের মানুষটি আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বা নিতে যাচ্ছে। এর মধ্যে কিছু রয়েছে ব্যক্তির অনুভূতির প্রকাশ আর কিছু তার আচরণগত পরিবর্তন। অনুভূতিগুলোর মধ্যে রয়েছে—জীবনের কোনো অর্থ না পাওয়ার অনুভূতি; ফাঁদে পড়া, অসহ্য কষ্ট ও অন্যদের বোঝা হওয়ার অনুভূতি প্রকাশ ইত্যাদি। এ অনুভূতির পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তির মধ্যে আচরণগত যেসব পরিবর্তন আসতে পারে, সেগুলো হলো—মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা নিয়ে কথাবার্তা বলা, আত্মহত্যার উপায় নিয়ে গবেষণা করা, চিরবিদায় জানানো, মাদক নেওয়া বা মদপান বেড়ে যাওয়া, ঘুমের অভ্যাসে পরিবর্তন, অতিঘুম বা অনিদ্রা, একা থাকা, স্বাভাবিক কাজকর্ম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, আগ্রাসী ও বেপরোয়া আচরণ, প্রতিশোধ বা প্রচণ্ড ক্রোধ প্রকাশ, নিজের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ বিলিয়ে দেওয়া। এছাড়া আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তির মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মানসিক অবস্থা দেখা যায়, সেগুলো হলো—বিষণ্নতা, উদ্বেগ, অস্থিরতা, সবকিছুতেই আকর্ষণ হারিয়ে ফেলা, খিটখিটে ভাব, চড়া মেজাজ ইত্যাদি।

আপনার যদি কখনো মনে হয় যে, আপনার পাশের মানুষটি এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে, তবে দেরি না করে তার কাছে সরাসরি এ বিষয়ে জানতে চান। আপনি নিজে যদি এ বিষয়ে প্রশ্ন করতে আত্মবিশ্বাসী বা অভিজ্ঞ না হয়ে থাকেন, তবে এমন কাউকে খুঁজে বের করতে হবে, যিনি এ বিষয়ে পারদর্শী।

আত্মহত্যা যেহেতু সামাজিক ও মানসিক নানামুখী উপাদানের সমন্বিত ফল, তাই এর প্রতিরোধেও প্রয়োজন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ।

মানসিক চাপ বা আত্মঘাতী চিন্তা মোকাবিলার উপায় এবং আত্মহত্যা ও এর প্রতিরোধ সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিয়ে জনগণকে সচেতন করতে হবে। আত্মহত্যার ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিরা কীভাবে ও কোথায় সহায়তা পেতে পারেন, সে বিষয়ে দিতে হবে সঠিক তথ্য।

n লেখক :ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, টাইগার আইটি বাংলাদেশ লিমিটেড