বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২০, ২২ শ্রাবণ ১৪২৭
২৯ °সে

র‌্যাব-ডিবি জিজ্ঞাসাবাদে সাহেদ

অর্ধশত রাজনীতিক, ব্যবসায়ী  ও সাংবাদিক সুবিধা নিয়েছে 

অর্ধশত রাজনীতিক, ব্যবসায়ী  ও সাংবাদিক সুবিধা নিয়েছে 
সাহেদকে আদালতে হাজির করা হচ্ছে। ছবি : ইত্তেফাক

করোনার ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার প্রতারণায় গ্রেফতার রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছেন, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সিনিয়র সাংবাদিক মিলিয়ে অন্তত অর্ধশত ব্যক্তিকে বিভিন্ন সময় অর্থ দিয়েছেন। কিন্তু তার এই বিপদের সময় কেউ পাশে দাঁড়ায়নি। তার কাছ থেকে সুবিধা নেওয়া সবার মুখোশ উন্মোচনের কথাও বলেছেন তিনি।

গ্রেফতারের পর ঢাকায় আনার সময় র‌্যাব ও পরে রাতে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) জিজ্ঞাসাবাদে সাহেদ এসব কথা বলেছেন। যদিও তার দেওয়া তথ্য যাচাই বাছাই শুরু হয়েছে। তদন্তকারীরা বলছেন, যাদের নাম আসছে, তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে সাহেদকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত তার ১০ দিনের এবং রিজেন্ট হাসপাতালের এমডি মাসুদ পারভেজের ১০ দিন ও কর্মী তরিকুল ইসলামের ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আদালতের কাঠগড়ায় নিজেকে নির্দোষ দাবি করে কেঁদে ফেলেন এই প্রতারক। এমনকি নিজে ও তার বাবা করোনায় আক্রান্ত হওয়ার কথাও বলেন। এক মাস বাড়ি যেতে পারেননি, ছোট্ট সন্তানেরও মুখও দেখতে পারেননি এমন কথাও বলেন। যদিও উপস্থিত আইনজীবীরা তাকে থামিয়ে দেন।

মো. সাহেদকে আদালতে নেওয়ার সময় কোমরে মোটা দড়ি বেঁধে আদালতে হাজির করা হয়। ঢাকার চিফ মেট্টোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত শুনানির পর তাদের তিনজনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। সাহেদের গায়ে ছিল নীল রঙের শার্ট আর শরীরে ছিল বুলেট প্রুফ জ্যাকেট। মাথায় হেলমেট। চোখে কালো চশমা। সাহেদ আদালতকে বলেন, ‘স্যার, যখন কেউ করোনার চিকিৎসা দিতে এগিয়ে আসেনি, তখন আমি, আমার হাসপাতাল এগিয়ে এসেছিল। সরকারের সঙ্গে চুক্তি করেছি। আমি নিজেও করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলাম। আমার বাবা করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। আমার ব্যবস্থাপনা পরিচালক করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে এক মাস আমাকে বাসায় থাকতে হয়েছে।’

আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ বলেছে, সাহেদ নিজেকে ক্লিন ইমেজের লোক বলে দাবি করেন। তবে প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকৃতপক্ষে সাহেদ একজন ধুরন্ধর, অর্থলিপ্সু ও পাষণ্ড প্রকৃতির লোক। অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে তাদের কাছে মানুষের জীবন-মৃত্যুর কোনো মূল্য নেই। সাহেদ তার সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট ও চিকিৎসা দেওয়ার নামে প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। সাহেদের প্রতারণার বিষয়টি জানার পর কোনো রোগী যদি প্রতিবাদ করতেন, তাদের তিনি বিভিন্নভাবে হুমকি দিতেন। এর ফলে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পেতেন না।

গত মার্চ মাস থেকে এখন পর্যন্ত সাহেদ করোনার ভুয়া রিপোর্ট ও চিকিৎসার প্রতারণার মাধ্যমে তিন থেকে চার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করেছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর আবদুল্লাহ আবু আদালতকে বলেন, সাহেদ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন। এর কোনো ক্ষমা নেই। সাহেদ হলেন দেশের শত্রু। তিনি ও তার সহযোগীরা ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

আরো পড়ুন : ফাহিম সালেহের খুনি চিহ্নিত, সন্দেহে ব্যবসায়িক লেনদেন

তিনি বলেন, কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আসামি সাহেদ একসময় কাঁদতে থাকেন। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, করোনায় আমার বাবা মারা গেছে। আমরা তাকে বলি, শান্ত হোন, আগেই এটা বোঝা উচিৎ ছিল আপনার। আব্দুল্লাহ আবু বলেন, শুনানির এক পর্যায়ে সাহেদ পানি খেতে চাইলে বিচারক পানি অন্য একজনকে আগে পান করে পরীক্ষার পর সাহেদের হাতে বোতল দিতে বলেন। আদালতের একজন কর্মচারী তখন নিজে পরীক্ষা করে বোতল সাহেদের হাতে দেন।

তবে সাহেদের আইনজীবীরা আদালতের কাছে দাবি করেন, সাহেদ ষড়যন্ত্রের শিকার। ৬ হাজার করোনার ভুয়া রিপোর্ট তৈরির অভিযোগ একেবারেই ভিত্তিহীন। কোনো ভুক্তভোগী এই মামলা করেনি। মামলায় সাহেদসহ অন্যদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগও নেই। আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে রিমান্ডের আদেশ দেন।

গত বুধবার সাহেদ গ্রেফতারের পর হেলিকপ্টারে ঢাকায় আনার সময় তার কাছে বেশি কিছু বিষয় জানতে চান র‌্যাব কর্মকর্তারা। পরে বিকেলে ডিবিতে হস্তান্তরের পর রাতে গোয়েন্দা পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। সেখানেও অকপটে অনেক কিছুই বলেছেন সাহেদ। যদিও তার তথ্যের সত্যতা এখনো যাচাই করতে পারেনি গোয়েন্দারা। এসব জিজ্ঞাসাবাদে সাহেদ বলেছেন, গত ১০ বছরে বহু মানুষকে তিনি উপকার করেছেন। অনেক রাজনীতিবিদকে অর্থ দিয়েছেন। অনেক ব্যবসায়ীও তার কাছে এসেছে। এমনকি বেশ কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিক নানা উছিলায় তার কাছ থেকে অর্থ নিয়েছেন। পালিয়ে থাকার সময় তিনি দেখেছেন ওই সাংবাদিকরাও তার বিরুদ্ধে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তিনি এখন তাদের মুখোশ উন্মোচন করতে চান।

এদিকে রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান স্কুল শেষ করেননি বলে আলোচনা থাকলেও জাতীয় পরিচয়পত্রে নিজের নাম সংশোধন করে ‘সাহেদ করিম’ থেকে ‘মোহাম্মদ সাহেদ’ হওয়ার সময় তিনি ‘ও’ লেভেলের সনদ দাখিল করেছিলেন নির্বাচন কমিশনের কাছে। জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বলছেন, সাহেদের ওই শিক্ষাগত সনদের সত্যতা তারা খতিয়ে দেখবেন। জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য দেওয়া তথ্যে সাহেদ নিজেকে স্নাতক ডিগ্রিধারী বলে উল্লেখ করেছেন।

উল্লেখ্য, গত বুধবার সকালে ‘সীমান্ত পেরিয়ে পালানোর সময়’ সাতক্ষীরা থেকে গ্রেফতার করা হয় সাহেদকে। এরপর হেলিকপ্টারে করে তাকে ঢাকায় আনা হয়। তার বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক মামলাও রয়েছে। এর আগে গত ৬ থেকে ৮ জুলাই উত্তরা ও মিরপুরের রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে করোনা ভাইরাস পরীক্ষার রিপোর্ট জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ার পর হাসপাতাল দু’টো বন্ধ করে দেয় র‌্যাব। তখন থেকেই পলাতক ছিলেন সাহেদ। ঢাকার মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৯ জুলাই রাতে মারা যান সাহেদের বাবা সিরাজুল করিম। তিনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন।

ইত্তেফাক/ইউবি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত