​​​​​​​করোনায় ১৬% নারী চাকরিচ্যুত হয়েছেন

করোনায় শ্রমজীবী নারীদের আর্থ সামাজিক অবস্থা নিয়ে মহিলা পরিষদের সমীক্ষা প্রকাশ

করোনায় শ্রমজীবী নারীদের আর্থ সামাজিক অবস্থা নিয়ে মহিলা পরিষদের সমীক্ষা প্রকাশ
করোনায় শ্রমজীবী নারীদের আর্থ সামাজিক অবস্থা নিয়ে মহিলা পরিষদের সমীক্ষা প্রকাশ।ছবি: ইত্তেফাক

সাম্প্রতিক সময়ে করোনা মহামারি স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরির সাথে সাথে আর্থিক, সামাজিক, পারিবারিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও বড় ধরণের অভিঘাত তৈরি করেছে, যা নারীদের ওপর ভিন্ন ধরণের প্রভাব তৈরি করেছে। দেশের শ্রমশক্তিতে ৩০% নারীরা যুক্ত, যাদের অধিকাংশই ইনফরমাল সেক্টরে কাজ করেন। তাদের অনেকেই করোনাকালীন সময়ে কাজ হারিয়েছেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ পরিচালিত এক সমীক্ষায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ চলমান করোনা ভাইরাস মহামারিতে (কোভিড-১৯) বাংলাদেশের শ্রমজীবী নারীদের আর্থ সামাজিক অবস্থান সম্পর্কিত একটি সমীক্ষা পরিচালনা করেছে। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১ টায় সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে অনলাইনে সংবাদ সম্মেলনে সমীক্ষা উপস্থাপন করা হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম।

সমীক্ষার তথ্য মতে, সর্বোচ্চ ৩৯% নারী হচ্ছেন ফ্যাক্টরি শ্রমিক, যারা বিভিন্ন কারখানায় (যেমন, পোশাক শিল্প, জুতা তৈরির কারখানা, ব্যাগ তৈরি ইত্যাদি) কাজ করেন। করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট সমস্যায় দীর্ঘ সময় ধরে কারখানার শ্রমিক নারী, গৃহকর্মী, দিনমজুর, নির্মাণ শ্রমিক, হোটেলের রান্না বা মসলা বাটার কাজ করেন প্রভৃতি-এমন খেটে খাওয়া শ্রমজীবী নারীরা এখন গৃহবন্দী। বেশির ভাগেরই কাজ নেই, বেতন বন্ধ। সাধারণ ছুটিতে কারখানা বন্ধ আছে বলে ১৮% নারী শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারছেন না। আশিংক বেতন পাচ্ছেন ১৬% এবং বেতন বন্ধ ৩০% নারীর ।

সমীক্ষায় বলা হয়, চাকরিচ্যুত হয়েছেন ১৬% এবং সাময়িকভাবে ছাটাঁই হয়েছেন ২০% নারী। গৃহকর্মী হিসেবে যারা কাজ করতেন তাদেরকে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য বাসা বাড়িতে আপাতত কাজে নিচ্ছে না। বেতন বন্ধ বা আংশিক বেতন থাকায় ৫২% নারী আর্থিক সংকটে আছেন। অন্যদিকে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবীরা সর্বোচ্চ করোনা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন, ঘরে খাবার না থাকায় নিম্নমানের জীবন যাপন করছেন ৩০% ও পরিবারের ভরণপোষণ করতে পারছেন না ২৮% নারী। খুব অল্প সংখ্যক নারী চাকরির বেতন দ্বারা ৩% সংসারের খরচ মেটাচ্ছেন। এমতাবস্থায় সন্তানের লেখাপড়ার খরচ বহন করা কষ্টকর হচ্ছে এবং শিশু শ্রম ও বাল্য বিবাহের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে নারীর প্রতি সহিংসতা।

আরও বলা হয়, ৬৭% শ্রমজীবী নারী জানিয়েছেন-করোনাকালীন সময়ে পারিবারিক নির্যাতন বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবেশীর কাছে বার বার সাহায্যের জন্য যাওয়ায় লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন, বাড়িওয়ালা বাড়ি থেকে চলে যেতে হুমকি দিয়েছেন। তাছাড়াও আর্থিক সহায়তা ও কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে শ্রমজীবী নারীরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তবে উদ্বেগজনক হলো করোনাকালীন সময়ে নারী ব্যাপকভাবে নির্যাতনের শিকার হলেও খুব অল্প সংখ্যক নারী নির্যাতনের ঘটনায় অভিযোগ করেছেন পুনরায় নির্যাতনের শিকার হওয়ার ভয়ে ও বাড়িছাড়া হওয়ার ভয়ে।

সভাপতির বক্তব্যে সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘পৃথিবীব্যাপী যেকোনো দুর্যোগে নারীরা বেশি আক্রান্ত হয়। অথচ নারীদের সুরক্ষায় যে জেন্ডার বিভাজন ডাটা থাকা দরকার সেটি কখনোই গুরুত্ব পায় না।এই পরিস্থিতিতে সমীক্ষাটি কেবল ইনফরমাল সেক্টরের নারীদের দেওয়া তথ্যের আলোকে করা হয়েছে।’

এছাড়াও সাংবাদিকের প্রশ্নোত্তরে তিনি বলেন, ‘মাত্র ৩১% নারী মনে করেন সহিংসতার ঘটনায় তাদের বিচার প্রাপ্তির সুযোগ আছে। এটি করোনা পরিস্থিতি আরও সীমিত করে দিয়েছে।’ অন্যদিকে সামাজিক পরিস্থিতির কারণে অনেকে মামলা করতে চায় না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সভায় সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু, সহ সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. মাসুদা রেহানা বেগম, সংগঠন সম্পাদক উম্মে সালমা বেগম, প্রকাশনা সম্পাদক সারাবান তহুরা, আন্তর্জাতিক সম্পাদক রেখা সাহা; প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পাঠাগার উপ-পরিষদ সদস্য হুমায়রা খাতুন, সাংবাদিক এবং সংগঠনের কর্মকর্তাসহ ২৫ জন উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশের শ্রমজীবী নারীদের আর্থ সামাজিক অবস্থান সম্পর্কিত সমীক্ষার তথ্য উপস্থাপন করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পাঠাগার উপ-পরিষদের রিসার্চ ও ট্রেনিং অফিসার ও সদস্য আফরুজা আরমান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পাঠাগার উপ-পরিষদ সম্পাদক রীনা আহমেদ।

উল্লেখ্য, সমীক্ষার জন্য সংগঠনের ২৬ টি জেলা শাখার সংগঠকদের মাধ্যমে তথ্য সংগৃহীত হয়েছে। প্রতিটি জেলা হতে পাঁচজন করে মোট ১৩০ জন শ্রমজীবী নারী এ সমীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। সমীক্ষায় দেখা গেছে অংশগ্রহণকারী শ্রমজীবী নারীরা বেশিরভাগই বিভিন্ন কারখানার শ্রমিক ও স্বল্প আয়ের মানুষ।

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত